kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

বসুন্ধরা গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা

মাসে দুই হাজার টাকা ভাতা পাবেন নৌযান শ্রমিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মাসে দুই হাজার টাকা ভাতা পাবেন নৌযান শ্রমিকরা

পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত নৌযান শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপসহ দেশের আরো কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ নৌযানে নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য মাসে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে খোরাকি ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপ ছাড়াও একই হারে ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো আবুল খায়ের গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ। আরো একাধিক গ্রুপ এই ভাতা দিতে সম্মত হতে পারে বলে গতকাল বিকেল পর্যন্ত জানা গেছে।

এদিকে নৌপথে চাঁদাবাজি-ডাকাতি বন্ধ করা, ২০১৬ সালে ঘোষিত গেজেট অনুযায়ী নৌযান শ্রমিকদের বেতন প্রদান নিশ্চিত করা; ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস, মালিক কর্তৃক খাদ্য ভাতা প্রদান, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং নৌ শ্রমিককে মালিক কর্তৃক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও সার্ভিস বুক প্রদানসহ ১১ দফা দাবি আদায়ে ধর্মঘট শুরু করেছে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। সোমবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে দুই লাখের বেশি শ্রমিক কাজ বন্ধ রেখেছেন বলে দাবি করেছেন শ্রমিকরা।

এই ধর্মঘটের কারণে দেশের বিভিন্ন নৌপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। বন্দরগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে বেশি। লাইটার জাহাজ বন্ধ থাকায় পণ্য ওঠানামাও প্রায় অচল হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। ঢাকার সঙ্গেও অন্য এলাকার পণ্য পরিবহনে দেখা দেয় অচলাবস্থা।

পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা মহামারির ধকল কাটাতে যখন সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক খাতের বিপর্যয় ঠেকিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তখন পণ্যবাহী নৌযান বন্ধ করে ধর্মঘট ডাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা সরকারকে জিম্মি করতে মহলবিশেষের একধরনের ষড়যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে। তবু আমরা সরকারের পক্ষ থেকে এসব পণ্যবাহী জাহাজের মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে মধ্যস্থকারী হিসেবে কাজ করছি। উভয় পক্ষকেই আমরা অনুরোধ জানিয়েছি একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে সমঝোতা করার জন্য। এ ক্ষেত্রে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে শ্রমিকদের প্রতি বারবার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘শ্রমিক স্বার্থে আমি বিভিন্ন শিল্প মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি এগিয়ে আসার জন্য। বসুন্ধরা গ্রুপ শুরুতেই এই অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাদের নৌযানগুলোর প্রত্যেক শ্রমিককে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে খোরাকি বা খাদ্য ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এরপর আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একইভাবে দিচ্ছে। এ জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।’

এদিকে গতকাল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান বাস্তবতায় নৌযান শ্রমিকদের সব দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই ধর্মঘটকে তারা অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করে। তবে আজ থেকে শ্রমিকদের বেতন ও খোরাকি ভাতা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌযাত্রী চলাচল সংস্থা, লঞ্চ মালিক সমিতি, ওয়েল ট্র্যাকার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ আরো নৌযান মালিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল হকসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. বাহারুল ইসলাম বাহার জানান, ১১ দফা দাবি নিয়ে সোমবার রাতে ঢাকায় বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিকদের বৈঠক হয়। গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাই গত মধ্যরাত থেকে নৌযান শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, ১১ দফা দাবি নিয়ে গত দুই বছরে নৌযান শ্রমিকরা তিনবার কর্মবিরতি পালন করেছেন। এরপর শ্রম প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মালিক-শ্রমিক বৈঠকে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা মেনে নেননি মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা। যার পরিপ্রেক্ষিতে আবারও কর্মবিরতি পালন শুরু হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মবিরতি চলবে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেছেন, লাইটার জাহাজ শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য দাবি পূরণ হচ্ছে না বলেই তাঁরা এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। সরকারের দায়িত্ব আলাপ-আলোচনা করে এর সমাধান করা। গতকাল বিকেলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এ কথা বলেন।

চট্টগ্রামের পরিস্থিতি : ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে বহির্নোঙরে ৫৪টি বিদেশি জাহাজে ১০ লাখ টন পণ্য আটকা পড়েছে। এসব জাহাজে গম, ভুট্টা ও ছোলা আছে সাড়ে চার লাখ টন; পশুখাদ্য আছে দেড় লাখ টন এবং বাকিটা পাথর, কয়লা ও সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল। জাহাজ থেকে নামিয়ে এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাট এবং বহির্নোঙর থেকে ছোট জাহাজে সরাসরি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নেওয়ার কথা ছিল। সোমবার রাত ১২টা থেকে ধর্মঘটের কারণে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় অচলাবস্থা চলছে।

তবে বহির্নোঙর থেকে পণ্যবাহী বড় কনটেইনার এবং খোলা দুই ধরনের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসা-যাওয়া করেছে সঠিক সময়ে; একই সঙ্গে বন্দরের ভেতর ১৮টি জেটিতে পণ্য ওঠানামা পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। নৌযান শ্রমিক ধর্মঘটের কোনো নেতিবাচক প্রভাব সেখানে পড়েনি। তবে ধর্মঘট আজ বুধবারও অব্যাহত থাকলে কাল বৃহস্পতিবার থেকে এর প্রভাব পড়তে শুরু করবে।

শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম শামসুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, বহির্নোঙরে পণ্য নামানোর কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সাগরে অলস বসে থাকার জন্য এক দিনে ১০ হাজার মার্কিন ডলার বাড়তি দিতে হবে জাহাজ মালিকদের; এই টাকা চলে যাবে বিদেশে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলছেন, ‘ধর্মঘট কোনো সমাধান নয়। কভিড-১৯ নিয়ে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি আমরা। এই সময়ে এমন ধর্মঘট পরিস্থিতি উত্তরণের গতিকে থমকে দেবে।’

প্রতিদিন ৩০টির মতো লাইটার জাহাজ পণ্য আনতে বহির্নোঙরে যায়; গতকাল বুকিং থাকলেও তারা রওনা দিতে পারেনি বলে জানিয়েছেন লাইটার জাহাজ বুকিং প্রদানকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশীদ খান।

চট্টগ্রাম জেলা নৌ শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের সহসভাপতি মো. নবী আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১১ দফা দাবি আদায়ে গত দেড় বছরে আমরা তিনবার ধর্মঘট ডেকেছি। বেশির ভাগ দাবি আদায় করবে জাহাজ মালিকপক্ষ, কিন্তু তারা বারবারই আশ্বাস দিয়েছে, বাস্তবায়ন করেনি।’

অন্যান্য এলাকা : ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে বরিশালেও। তবে লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশন ও নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি শেখ আবুল হাসেম জানান, সারা দেশের মতো বরিশাল অঞ্চলেও পণ্যবাহী বাল্কহেড, জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একইভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে খুলনার নৌপথগুলো। কোনো ধরনের পণ্যসামগ্রী ওঠানামা করেনি। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে খুলনার বিআইডব্লিটিএ ঘাট এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন। মোংলা বন্দরেও অচলাবস্থার তৈরি হয়েছে।

নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতি শুরু হওয়ায় বন্দরের পণ্য বোঝাই-খালাস কাজ স্বাভাবিক রাখতে নৌযান শ্রমিকদের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি যাতে দ্রুত সুরাহা করা যায় সে জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি।’

নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজে লোড-আনলোড বন্ধ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ২৫টি ঘাটে নোঙর করা আছে প্রায় এক হাজার জাহাজ ও পাঁচ হাজার বালুবাহী জাহাজ (বাল্কহেড)। গতকাল সকালে ও বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে কর্মবিরতির সমর্থনে দুই দফা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বাংলাদেশ জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা।

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা ও মোংলা প্রতিবেদকরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা