kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

দাবি পূরণে আন্দোলন থামে, সংকট কাটে না

এম বদি-উজ-জামান ও এস এম আজাদ   

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দাবি পূরণে আন্দোলন থামে, সংকট কাটে না

পরিকল্পিত এবং সংঘবদ্ধভাবে দেশে ধর্ষণের বিস্তার ঘটলে সম্প্রতি যে আন্দোলন দানা বাঁধে তার পরিপ্রেক্ষিতে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয় গত ১৩ অক্টোবর। কিন্তু এর পরও ধর্ষণ থামেনি। ১৩ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছয় দিনে ৩৭ জনকে ধর্ষণ এবং ১০ জনকে ধর্ষণচেষ্টায় মামলা হওয়ার খবর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালে দেশবাসী ও বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে বাংলাদেশে বেপরোয়া সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন চেয়ে রাজপথ কাঁপানো আন্দোলন। সরকার তখনো আন্দোলনকারীদের বেশির ভাগ দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে সড়ক আইন সংশোধন করে। কিন্তু এখনো প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ যাচ্ছে সড়কে।

একইভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলন, কোটা সংস্কারের আন্দোলন এবং শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আন্দোলনে সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কোনো সমস্যারই পুরো সমাধান হয়নি। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত সংশোধন হচ্ছে আইন। কিন্তু যে কারণে আইন সংশোধন হচ্ছে, সরকারি সিদ্ধান্ত আসছে; সেসব সমস্যা তিমিরেই থেকে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন সংশোধন বা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থায় আন্দোলন স্থিমিত হচ্ছে। তবে পূর্বাপর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এসব আন্দোলন কার্যত সফলতা পাচ্ছে না। সরকারের শুভ উদ্যোগও ভালো ফল বয়ে আনতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে অবস্থা বদলাতে। সরকারের নির্দেশনা কার্যকরে বিভাগীয় কঠোর নজরদারিও প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশু শ্রেণি থেকেই পাঠ্যপুস্তকে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এবং সে অনুযায়ী পাঠদান করা হলে চরিত্র গঠন হবে। যার প্রভাবে সমাজ থেকে অপরাধ কমবে।

সাবেক প্রধান বিচারপতি, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন সংশোধন করে মানুষের স্বভাব বদলানো যাবে না। আইন দিয়ে মানুষকে ভদ্রলোক বানানো যাবে না। যেমন—হত্যার ঘটনায় শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকার পরও কিন্তু হত্যা বন্ধ হয়নি। অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনতে হলে মানুষের স্বভাবের পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) নারীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন তা শিশু শ্রেণিতেই পাঠ্যপুস্তকভুক্ত করে পড়াতে হবে। পাশাপাশি বড় বড় মনীষীর মধ্যে যাঁরা নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছেন, তাঁদের সেসব ঘটনা ছোটদের উপযোগী করে লিখে পাঠ্য করতে হবে। শিক্ষকদেরও সেভাবে সুন্দর করে একজন নারীকে শিশুদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে একজন নারী কারো মা, কারো বোন, কারো মেয়ে। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকতে হবে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার তদন্ত দ্রুত ও সঠিক হতে হবে, বিচার দ্রুত হতে হবে। আর বিচার শেষে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটা করা গেলেই কেবল অপরাধপ্রবণতা কমবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন সংশোধন করে তখনই লাভ হবে, যখন ওই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হবে। ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সাজার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। এখন যদি ধর্ষণের কয়েকটি মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর করা যায় তবে দেখবেন এর প্রভাব সমাজে পড়েছে। অর্থাৎ আইনের কঠোর প্রয়োগ হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও ভয় পাবে। ঠিক একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও আইনের কঠোর প্রয়োগ হতে হবে। আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি পক্ষপাতিত্ব করা হয়, তখন যত কঠিন আইনই করুন না কেন তাতে লাভ হবে না।

সাম্প্রতিককালে আন্দোলনের মুখে নতুন আইন করা বা পুরনো আইন সংশোধনের মধ্যে অন্যতম হলো—ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন।

সম্প্রতি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বন্ধে নিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে কঠোর শাস্তি কার্যকরের দাবি ওঠে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং সিলেটের এমসি কলেজে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই দাবি দানা বাঁধে। দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত ৯ অক্টোবর বিকেলে শাহবাগে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে আয়োজিত মহাসমাবেশে নারী নির্যাতন বিশেষ করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি জানানো হয়। সারা দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ধর্ষণবিরোধী এই গণ-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর কয়েকটি ধারা সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আগের আইনে ধর্ষণের শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড হলো না কী হলো এখনো অনেকে তোয়াক্কা করে না। মাদকের আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় অনেককে বেপরোয়া করে তুলছে। সঠিক পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে আইনের কঠোর কার্যকরের সঙ্গে মাদক আর মদদ বন্ধ করতে হবে। যুবসমাজকে উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। তা না হলে জনদাবি ও সরকারের শুভ উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে না।’

নিরাপদ সড়কের দাবিগুলো বাস্তবায়নই হয়নি

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুটি বাসের রেষারেষিতে রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম ও আব্দুল করিম রাজীব নির্মমভাবে নিহত হয়। এরপর ফেসবুকে ‘সড়ক হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই’ নামে খোলা ইভেন্ট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে। শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া চালনায় মৃত্যু ঘটানো চালকের সর্বোচ্চ সাজার পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে ৯ দফা দাবি তুলে ধরে। তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভা একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করে, যে আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যুদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া চালনায় মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশ্বাসে সড়ক থেকে শ্রেণিকক্ষে ফেরে শিক্ষার্থীরা। তবে পুরো শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণসহ তাদের দাবিগুলো আলোর মুখ দেখেনি এখনো। গত বছরের ১৯ মার্চ প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে সুপ্রভাত বাসের চাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহাম্মেদ চৌধুরী নিহত হলে দ্বিতীয় দফায় নিরাপদ সড়কের আন্দোলন শুরু হয়। বিইউপির শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সে আন্দোলনে একই রকম আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়। ঘটনাস্থলে নিহত আবরারের নামে একটি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ ছাড়া বাকি দাবিও আটকে আছে আশ্বাসে। এখনো প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ।

অন্যদিকে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে ‘সড়ক পরিবহন আইন পাস’ হলেও তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। উল্টো আইনের প্রতিবাদে গত বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে পরিবহন শ্রমিকরা জেলায় জেলায় ধর্মঘট শুরু করে। সপ্তাহখানেক পরিবহন খাতে অচলাবস্থা চলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আইনের তিনটি ধারার প্রয়োগ চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। আইনের কিছু ধারা সংশোধনের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে শ্রমিকরা। এখনো হয়নি নতুন আইনের বিধিমালা। হয়নি সংশোধনও। কাগজপত্র নবায়নের জন্য বেঁধে দেওয়া সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়েছে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ মেহেদী দীপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছি তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা মূলত চাইছি, শৃঙ্খল নিরাপদ সড়ক। এর উল্টো আমাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করা হয়েছে। কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হলেও এখনো কমপক্ষে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা আছে। সে রকম আন্দোলন না হলেও সড়কের নিরাপত্তার দাবি পূরণে আমরা এখনো কথা বলে যাচ্ছি।’

ভ্যাট বাতিলের পর মনগড়া ফি

২০১৫ সালে সরকার টিউশন ফির ওপর ৭.৫ শতাংশ হারে মূসক বা ভ্যাট নির্ধারণ করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘নো ভ্যাট’ আন্দোলন শুরু করেন। রাজধানীতে জনজীবন স্থবির করে দেওয়া ওই আন্দোলনের মুখে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করে সরকার। ওই সময় সরকারের এই পদক্ষেপকে দাবির বাস্তবায়ন বলে ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলনের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যাচ্ছেন। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আরিফ চৌধুরী শুভ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নো ভ্যাট আন্দোলনে আমাদের পাঁচটি দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা। কিন্তু সেটি হয়নি। সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ালেও এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ফির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে নিচ্ছে। শেষ সেমিস্টারে এসব করে, ফলে কোনো শিক্ষার্থী প্রতিবাদ বা আন্দোলনে যেতে পারে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান না বানাতে পারলে তারা আমাদের কাছ থেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভ্যাট আদায় করে ছাড়বে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা