kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই

২০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই

দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরের কথা, মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। রাজধানীর চিটাগাং রোডে চলাচলকারী একটি বাস থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও এখনো বিপদ কাটেনি। সরকার ও বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউয়ের। সব পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে। সরকারও সব কিছু স্বাভাবিক করার সুযোগ দিয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ মানছে না অপরিহার্য স্বাস্থ্যবিধি। গত শনিবার রাজধানী ঘুরে এমন চিত্র তুলে এনেছেন লায়েকুজ্জামান, বাহরাম খান, শাখাওয়াত হোসাইন ও জহিরুল ইসলাম।

হাসপাতালেও মাস্ক ব্যবহারে উদাসীনতা : দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী ও স্বজন মাস্ক ব্যবহার করছে না। অনেকের পকেটে মাস্ক থাকলেও ব্যবহার করছে না। আবার কেউ কেউ ঝুলিয়ে রাখছে থুতনিতে। কারো কারো সঙ্গে মাস্কই নেই।

নারায়ণগঞ্জ থেকে মেয়ের পায়ের ব্যথার সমস্যা নিয়ে বহির্বিভাগের অর্থোপেডিকস বিভাগে এসেছেন মান্নান মিয়া। মেয়ে মাহমুদা আক্তারের মুখে মাস্ক থাকলেও বাবা মান্নান মিয়ার মুখে মাস্ক নেই। মাস্ক ব্যবহার করছেন না কেন—জিজ্ঞাসা করতেই কঠোর ভঙ্গিতে মান্নান মিয়া বলেন, ‘আমি না পরলে আপনার সমস্যা কী? মরলে আমি মরমু, তাতে মাইনসের কি?’

একটু সামনে এগিয়ে টিকিট কাউন্টারের পাশে দেখা গেল ১৫-২০ জনের জটলা। কিন্তু এদের বেশির ভাগের মুখে নেই মাস্ক। তবে চিকিৎসকদের কক্ষে প্রবেশের আগে অনেকে পকেট বা ব্যাগ থেকে মাস্ক বের করে পরে নিচ্ছে। অনেককে মাস্ক ছাড়াই প্রবেশ করতে দেখা গেছে।

বহির্বিভাগের মহিলা ও শিশুদের চিকিৎসা দিতে ১৬ নম্বর কক্ষে বসা একজন চিকিৎসক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু হাসপাতালে নয়, সব স্থানেই মাস্ক পরা জরুরি। কিন্তু মানুষ সেটা মানছে না। আমরা চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের মাস্ক না পরে প্রবেশ করতে দিচ্ছি না। তার পরও গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় শক্ত অবস্থান নেওয়া যায় না।’

হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আবুল বাসার শিকদারের কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে, পাঁচজন সহকর্মী একসঙ্গে বসে কথা বললেও কারো মুখে মাস্ক নেই। মাস্ক নেই কেন জানতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সবাই মাস্ক দেখিয়ে জানান, নিজেরা নিজেরা বসে আছেন, তাই পরেননি।

ওয়ার্ড মাস্টার শিকদার বলেন, ‘ভাই, আমরা সব সময় মাস্ক পরে থাকি। কিন্তু রোগীর সঙ্গের লোকজন কথা শোনে না। পরিচালক স্যার প্রতিদিন মাস্ক পরার বিষয়ে মাইকে বলে দেন। আনসার সদস্যদেরও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

রেলে স্বাস্থ্যবিধি, অনীহা যাত্রীদেরও : সকাল পৌনে ৯টা। কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় সুন্দরবন এক্সপ্রেস। যাত্রীরা ট্রেনে প্রবেশ করছে। ট্রেনে ওঠার দরজার পাশে রাখা হ্যান্ড স্যানিটাইজার। দু-একজন যাত্রী নিচ্ছে। বেশির ভাগই ফিরেও তাকায় না। হ্যান্ড স্যানিটাইজার না নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে যাওয়া যাত্রী খুলনার তেরখাদার দেলোয়ার হোসেনকে জিজ্ঞাসা করলে রীতিমতো খেপে গিয়ে বলেন, ‘আমাকে সচেতনতা শেখাতে আসবেন না।’ কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় যাত্রীরা মোটেও সচেতন নয়।

প্রবেশদ্বারে যাত্রীদের দেহ জীবাণুমুক্ত করতে বসানো হয়েছে স্ক্যানিং মেশিন। রাখা হয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। স্টেশনে প্রবেশ, টিকিট কাউন্টারে দাঁড়ানো, ট্রেনে ওঠার সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করছেন রেলওয়ের নিরাপত্তা রক্ষীরা। মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ট্রেনে ওঠার পরই যাত্রীরা খুলে ফেলছে মাস্ক।

চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী টেনে গিয়ে দেখা যায়, অনেক যাত্রীর মুখে মাস্ক নেই। জানতে চাইলে একজন যাত্রী বলেন, ‘বেশি সময় মাস্ক মুখে রাখতে পারি না। দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই খুলে রেখেছি।’

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী বহনের বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সরঞ্জাম প্রস্তুত রেখেছে। যাত্রীরা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।’ 

সার্জেন্ট দেখলে মাঝেমধ্যে পরি : ঠিকানা পরিবহনের বাসটি সাইনবোর্ড এলাকা থেকে ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে সাভার পর্যন্ত যাওয়া-আসা করে। নীলক্ষেত থেকে ঠিকানা এক্সপ্রেসের ৪০ সিটের একটি বাসে উঠে বেশির ভাগ যাত্রীর মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। গুনে দেখা গেল পুরো বাসে ২৫ জন যাত্রী। এর মধ্যে আটজনের মুখে মাস্ক আছে। দুজন মাস্ক মুখে না পরে কানে ঝুলিয়ে রেখেছে। জানতে চাইলে যাত্রী মাহবুব সৈকত বলেন, ‘করোনা তো নাই। এইগুলা সব আন্দাজি তথ্য দেয়। আমি করোনা বিশ্বাস করি না, তাই মাস্কও পরি না।’

মাস্ক মুখে না পরে কানে ঝুলিয়ে রাখছেন কেন জিজ্ঞাসা করলে বয়স্ক এক যাত্রী বলেন, ‘সারা দিনই বাইরে থাকতে হয়। সব সময় মাস্ক মুখে রাখতে ভালো লাগে না। এ কারণে বাসে উঠে একটু খুলে রাখলাম।’

উত্তরা থেকে আজিমপুর পর্যন্ত চলাচল করে বিকাশ পরিবহন। আজিমপুর থেকে শুরুতে ১০-১২ জন যাত্রী উঠেছে। এদের মধ্যে চারজনের মুখে মাস্ক দেখা গেছে। বাসের চালক ও সহকারীর মুখেও ছিল না মাস্ক। শুক্রাবাদ এলাকায় পৌঁছলে বাস ভরে যায় যাত্রীতে। নির্ধারিত সিটের বাইরেও দাঁড়িয়ে থাকে অনেক যাত্রী। ভাড়া নিতে এলে সহকারীকে এত যাত্রী তোলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারা দিন দু-একবার একটু বেশি যাত্রী পাই। না নিলে কেমনে চলব! এখন তো সব সময় যাত্রী পাওয়া যায় না।’ 

মাস্ক কেন ব্যবহার করছেন না—এ কথার জবাবে বললেন, ‘ভাইরাস খাইতে খাইতে হজম হইয়া গেছে। রাত-দিন বাসের মইধ্যে থাকি। শত শত মানুষের সঙ্গে উঠাবসা। মাস্ক পইরা আর কি অইব।’

আর বাসের চালক বলেন, ‘মাস্ক আছে ভাই। সার্জেন্ট দেখলে মাঝেমধ্যে পরি।’

কড়াইলে করোনা কই : সরু ও ঘিঞ্জি রাস্তা দিয়ে হাজারো মানুষ চলাচল করছে। চায়ের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। মাস্ক ব্যবহার বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বালাই নেই কারো। রাজধানীর সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইলে দেখা গেছে এমন চিত্র। চায়ের দোকানে বসে থাকা কারো মুখে নেই মাস্ক। একই গ্লাসে পানি খাচ্ছে বহু মানুষ। দোকানে বসার ক্ষেত্রেও নেই ন্যূনতম দূরত্ব। সেখানে শিশুরাও রয়েছে। আর দল বেঁধে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে তরুণদের। তাদের মুখেও নেই মাস্ক। কড়াইল বস্তির বউবাজার, জামাইবাজার, বেলতলী, কামারবাড়ী, মশারবাজারসহ প্রায় সব এলাকায় একই চিত্র। এরশাদ স্কুল মাঠে অনেক শিশুকে খেলতে দেখা গেছে। তাদের মুখেও নেই মাস্ক।

বউবাজার এলাকায় সবজি বিক্রেতা তহুরা আক্তার বলেন, ‘কড়াইলে করোনা কই? কোনো করোনাফরোনা নাই। বস্তির মানুষের ওপর আল্লাহর রহমত আছে, তাই এখানে কোনো ক্ষতি হইব না।’

এরশাদ স্কুল মাঠে খেলতে আশা এক শিশু বলে, ‘স্কুল বন্দ। সক্কাল বেলা এহানে আসি। হারা দিন খেলি। করুনা নাই এইহানে।’

ওমর ফারুক কেরু নামের এক বস্তিবাসী বলেন, ‘বস্তিতে করোনার কোনো ভয় নাই। যে যার মতো চলাফেরা করছে, সেই শুরু থেকে। কিন্তু বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা