kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভাসানচরে সব সুযোগই আছে পালানো ছাড়া

মেহেদী হাসান, ভাসানচর থেকে ফিরে   

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাসানচরে সব সুযোগই আছে পালানো ছাড়া

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা অনেক। অসুবিধা যা আছে, সেটি অপরাধপ্রবণদের জন্য। আর তা হলো চাইলেই এখান থেকে পালানো যাবে না বা অবৈধভাবে মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর উদ্দেশে যাত্রা করা যাবে না। এ কারণেই হয়তো রোহিঙ্গাদের অনেকে ভাসানচরে পাকা ঘরে থাকা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার চেয়ে কক্সবাজারে গাদাগাদি করে থাকার পক্ষে। কারণ তারা সুযোগ পেলেই অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমাতে চায়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধেও পুরনো অভিযোগ, তারা মানবপাচারের শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার তথ্য জেনেও সেগুলো ঠেকানোর চেষ্টা করে না, বরং পাচারকারীচক্র মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জলসীমায় আনার পর ওই সংস্থাগুলো ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ তাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আবার এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশকে ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশের উদ্দেশে সাগরপথে পাড়ি জমালে দুর্নাম হয় বাংলাদেশের। তাদের উদ্ধারের জন্যও চাপ তৈরি হয় বাংলাদেশের ওপরই। এদিক বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা ঠেকাতে এবং সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিরাপদে রাখতে ভাসানচর আদর্শ জায়গা। কারণ সেখানে কারা ঢুকছে আর কারা সেখান থেকে বের হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।

বিগত বছরগুলোতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলোর তৎপরতা দেখলে বোঝা যায়, তারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজারেই তাদের রাখতে চাচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা নেওয়ার জন্য তারা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ভাসানচরে স্থানান্তরের তাগিদ দিয়ে আসছেন। তবে পশ্চিমা কিছু দেশ এবং দাতা সংস্থাগুলোর কয়েকটি শুরু থেকেই কার্যত এর বিরোধিতা করে আসছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভাসানচরের জন্য আমরা অনেক টাকা খরচ করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অনেকে চায় না রোহিঙ্গারা সেখানে যাক।’

তিনি বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ঘিরে দেশি-বিদেশি কিছু স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাভোগীচক্র আছে। তারাও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও অন্যত্র স্থানান্তরে বাধা।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সাগর থেকে উদ্ধার করে ৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে

আন্তর্জাতিক দুটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল। তবে বাংলাদেশ তা নাকচ করেছে। ভাসানচরে রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগ তুলে যে ছবি ওই এনজিওগুলো প্রকাশ করেছে, তারা ভাসানচরের নয় বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তা ছাড়া প্রকাশিত ছবিতে মেঝের সঙ্গেও ভাসানচরের ঘরের মেঝেগুলোর মিল নেই।

ভাসানচরে এখন আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা নেই। সেখানে রোহিঙ্গাদের খাবার জোগান দিচ্ছে নৌবাহিনী। তিন বেলা খাবারই শুধু নয়, গরমের সময় লেবুর শরবতও দেওয়া হয় তাদের। তবে বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গাদের অনেকেই কক্সবাজারে ফিরতে চায়। কারণ তাদের পরিবারের অনেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে আছে। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার থেকে তাদের পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে ভাসানচরে আনা বা ভাসানচর থেকে কাউকে কাউকে কক্সবাজারে নেওয়া—দুটিই সরকারের বিবেচনায় আছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রগুলো জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের নীতি নিবর্তনমূলক বা জোরজবরদস্তিমূলক নয়। সরকার রোহিঙ্গাদের স্বার্থেই তাদের বুঝিয়ে ও রাজি করিয়ে ভাসানচরে নিতে চায়।

ভাসানচরের বর্তমান বাসিন্দা ৩০৬ জন রোহিঙ্গার ২৬৮টি পরিবার। এক সদস্যের পরিবারের সংখ্যা ২৪৬। দুজন করে সদস্য আছে এমন পরিবারের সংখ্যা ৯। তিন সদস্যের পরিবার আছে ১০টি। চার সদস্যের পরিবার তিনটি। তারা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির ছেড়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে পাড়ি জমানোর জন্য।

ভাসানচর পরিদর্শনের পর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাসানচরে কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী আছেন, যাঁরা কক্সবাজার ছেড়েছিলেন মালয়েশিয়ায় তাঁদের স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য। টেলিফোনে তাঁদের বিয়ে হয়েছে। ওই রোহিঙ্গা নারীদের কেউ কেউ কক্সবাজার ফিরতে চান অবৈধভাবে সাগরপথে ইন্দোনেশিয়া বা অন্যত্র পাড়ি জমানোর জন্য। এক রোহিঙ্গা নারী জানিয়েছেন, অবৈধভাবে সাগরযাত্রা করে আবারও ধরা পড়লে তিনি পরে আবারও চেষ্টা চালাবেন। এভাবে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

গত সপ্তাহে ভাসানচরে অবস্থানকালে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্প। ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সেগুলো এখন ব্যবহার শুরু করা দরকার।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয়ার্ধে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল শুরুর পর কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে নতুন আশ্রয়স্থলের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেছেন, ভাসানচর প্রকল্পটি (আশ্রয়ণ-৩) ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এই প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে সার্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে থাকেন।

 

মন্তব্য