kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ধর্ষণবিরোধী লংমার্চ ফেনীতে আক্রান্ত

► সারা দেশে বিক্ষোভ কাল, বুধবার রাজপথ অবরোধের ডাক
► নোয়াখালীর সমাপনী সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, নোয়াখালী ও ফেনী প্রতিনিধি   

১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধর্ষণবিরোধী লংমার্চ ফেনীতে আক্রান্ত

ধর্ষণ ও নিপীড়ন বিরোধী লংমার্চ ফেনী পৌঁছলে তাদের ওপর এভাবেই হামলা চালানো হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

নোয়াখালী অভিমুখী ধর্ষণবিরোধী লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে ফেনী ও দাগনভূঞায় দুই দফা এই হামলায় ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়সহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগকর্মীরা এই হামলা চালিয়েছেন বলে দাবি করেছেন লংমার্চে অংশগ্রহণকারীরা। তবে সংবাদ সম্মেলন করে এই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে ৯ দফা দাবিতে গত শুক্রবার সকালে রাজধানী ঢাকা থেকে এই লংমার্চ শুরু করেন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের কয়েক শ নেতাকর্মী।

এদিকে নোয়াখালীর মাইজদীতে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ থেকে বক্তারা আগামীকাল সোমবার সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং বুধবার রাজপথ অবরোধের ডাক দিয়েছেন। ওই সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন নেতারা।

লংমার্চে অংশগ্রহণকারী কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তাঁরা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সমাবেশ করে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের সড়ক দিয়ে পাগলা মিয়া সড়কে অপেক্ষমাণ বাসের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় খাজুরিয়া এলাকায় কতিপয় যুবক তাঁদের ওপর লাঠি হাতে হামলা চালান। এতে ১০ নেতাকর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন সম্পাদক অনিক ছাড়াও যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক আশিকুল ইসলাম জুয়েল, ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী আশা, কর্মী বিজয়, শাহাদাত, জাওয়াদ, হৃদয়, শাওন ও অভি রয়েছেন। হামলাকারীরা ছাত্রলীগ-যুবলীগকর্মী বলে দাবি করেন তাঁরা। পরে সাড়ে ১২টার দিকে দাগনভূঞায় লংমার্চকে স্বাগত জানাতে স্থানীয় কর্মীরা জড়ো হলে সেখানেও ফের হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানেও কয়েকজন আহত হন।

এর আগে সকাল ১১টায় ট্রাংক রোডে দোয়েল চত্বরে পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ তিন কর্মীকে মারধর করলে উত্তেজনা দেখা দেয়। কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পরে পুলিশ ওই স্থান থেকে সরে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ওই সময় পাশেই শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ চলছিল। বাইরে ট্রাংক রোডের দোয়েল চত্বরে আগে থেকে ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) নিজাম উদ্দিন হাজারীর ছবিসংবলিত বড় বাঁধানো ফেস্টুন ছিল। সমাবেশ চলাকালে কে বা কারা ফেস্টুনের ওপর লাল রং দিয়ে ‘ধর্ষকদের পাহারাদার’ কথাটি লিখে দেয়। এ সময় জিরো পয়েন্টে দায়িত্বরত পুলিশ সেখানে উপস্থিত কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে তিনজনকে মারধর করে। বাইরে উত্তেজনা ও হট্টগোল শুরু হলে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শখানেক কর্মী বাইরে এসে বিক্ষোভ করেন। পরে প্রতিবাদের মুখে পুলিশ সরে গিয়ে আরো পশ্চিমে ‘বনফুল’-এর সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। শেষে নেতারা এসে কর্মীদের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নিয়ে যান।

যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নান্নু বলেন, ‘পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ আমাদের কর্মীদের ওপর বিনা কারণে হামলা চালিয়ে তাঁদের আহত করে।’

ফেনী ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন : বিকেলে শহরের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে জেলা ছাত্রলীগের নেতারা দাবি করেছেন, ‘লংমার্চের হামলার সঙ্গে আমাদের কোনো কর্মী জড়িত নন। তাদের দাবির সঙ্গে আমাদেরও সহমত রয়েছে। একটি মহল ফেনীর শান্তি বিনষ্ট করতে চায়।’ তাঁরা ফেস্টুনে নেতিবাচক মন্তব্য লেখার প্রতিবাদ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি এম সালাহউদ্দিন ফিরোজ ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হায়দার জর্জ। এদিকে এক বিবৃতিতে জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন বলেন, হামলার সঙ্গে যুবলীগের কোনো নেতাকর্মী কিছুতেই জড়িত থাকতে পারে না। সদর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন শীল বলেন, প্রধানমন্ত্রী ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে করে কিছু ব্যক্তির মাথা ঠিক নেই। তারাই পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘এটা আসলে তেমন কোনো বড় ঘটনা নয়। ট্রাংক রোডে এমপি মহোদয়ের ছবিসংবলিত ফেস্টুনে লাল রং দিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য লেখার ঘটনায় সেখানে লংমার্চকর্মীদের সঙ্গে এমপির সমর্থকদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।’

ঘটনাস্থলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি : এদিকে নোয়াখালীতে অবস্থানরত চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন গতকাল লংমার্চে হামলার ঘটনা শুনে ফেনীতে ছুটে আসেন। এ সময় ডিআইজি বলেন, সংসদ সদস্যের ছবিতে আপত্তিকর কথা লেখার কারণেই উত্তেজনাকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। থানায় কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সবাইকে আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলতে ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানান।

নোয়াখালীর মাইজদীতে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ : পাহাড়ে, সমতলে অব্যাহত ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ৯ দফা দাবিতে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ বক্তারা বলেছেন, ‘যারা ধর্ষকদের লালন-পালন করছে তাদের বিচার চাই। আমরা ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই। আমাদের শান্তিপূর্ণ লংমার্চে ছাত্রলীগ হামলা করেছে। আমাদের কত আর মারবেন? এ দেশের তরুণরা লড়াই করে যাবে। আমাদের আন্দোলন চলবে।’ গতকাল বিকেলে নোয়াখালী শহরের মাইজদীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরের ওই সমাবেশ থেকে নেতারা আগামীকাল সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও বুধবার সারা দেশে রাজপথ অবরোধের ডাক দিয়েছেন।

লংমার্চের নোয়াখালীর সমন্বয়ক ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি মোল্লা হাবিবুর রসুল মামুনের সভাপতিত্বে ও চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নোয়াখালীর সাধারণ সম্পাদক পলাশের সঞ্চালনায় ওই সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল, ছাত্রফ্রন্ট একাংশের সভাপতি মাসুদ রানা, ছাত্রফ্রন্ট অন্য অংশের সভাপতি আল কাদরী জয়, ছাত্র ফেডারেশনের গোলাম মোস্তফা, বাংলাদেশ নারী মুক্তির সীমা দত্ত, জামশেদ আনোয়ার তপন, হাবীব ইমন, নিখিল দাস, লক্ষ্মী চক্রবর্তী প্রমুখ। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে লংমার্চের যবনিকা টানেন আয়োজকরা।

হামলার প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ : ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন হামলা করে দমানো যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ সংগঠনের নেতারা। ফেনীতে লংমার্চ কর্মসূচির ওপর হামলার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা এই হুঁশিয়ারি দেন। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লাগাম টানার জন্য সরকারপ্রধানের প্রতি দাবি জানান তাঁরা। বক্তারা বলেন, এই লংমার্চ সরকার পতন বা কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে আয়োজন করা হয়নি। সারা দেশে অব্যাহতভাবে বেড়ে চলা ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এই লংমার্চের আয়োজন। এর পরও ফেনীতে লংমার্চ কর্মসূচির গাড়িবহরে হামলা করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের রক্তাক্ত করার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে।

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সহসাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমামের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা আসিফ মোহাম্মদ আশিক, ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতা রিয়াজ মাহমুদ, রোকেয়া সুলতানা, হাফিজ আদনান রিয়াদ, সাজেদুল হক রুবেল প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা