kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিশেষজ্ঞ মত

করোনার দ্বিতীয় ঢেউই এখন বড় শঙ্কা

অধ্যাপক সেলিম রায়হান

১৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনার দ্বিতীয় ঢেউই এখন বড় শঙ্কা

মাথাপিছু জিডিপিতে আমরা ভালো করছি—এটা আশাবাদের খবর। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধির যে হার বলছে, তা সরকারি হিসাবের চেয়ে কম। বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে তো ৮ শতাংশের ওপরে একটা আশাবাদ আছে। তবে আমি সে তর্কে যাচ্ছি না। আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, অন্যান্য দেশ যেখানে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ কিন্তু আসলে একটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে আছে। সেটার মাত্রা নিয়ে হয়তো কিছু কথা থাকতে পারে। তাই এটা আশাবাদী হওয়ার মতোই একটা বিষয়।

এমন একটা সংকটকালেও যে আমরা মোটামুটি পজিটিভ একটা গ্রোথ ধরে রাখতে পারছি, সেটাই বড় কথা। এটা কিন্তু এখনো রিয়ালাইজড হয়নি। এটার জন্য কিন্তু আরো অনেকটা সময় আছে। সুতরাং বছর শেষে আরো অনেক কিছু নির্ভর করবে রিয়ালাইজেশনের ক্ষেত্রে। সামনের মাসগুলোতে আমরা কিভাবে আগাচ্ছি, তার ওপর হয়তো অনেক কিছু নির্ভর করবে। এখানে দুটি বিষয়—একটা হলো অভ্যন্তরীণভাবে আমাদের পরিস্থিতিটা কেমন হবে। বিশেষ করে, যদি আমাদের এখানে সেকেন্ড ওয়েভ হয় বা করোনাভাইরাসের বিষয়টা যদি আরো একটু এক্সট্রিম লেভেলের হয় অথবা কমে যায়। দেখতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলো কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারছে। আমরা দেখেছি, গার্মেন্ট খাতগুলো এবং আরো ছোটখাটো কয়েকটা খাত হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে, কিন্তু রপ্তানি খাতের বাইরে তো আরো অনেক খাত আছে, প্রচুর সেবা খাত আছে—তারা কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারছে, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ তো গেল অভ্যন্তরীণ বিষয়।

বাহ্যিকভাবে আরেকটা বিষয় হলো, ইউরোপ-আমেরিকায় সেকেন্ড ওয়েভ অলরেডি শুরু হয়ে গেছে, সেটা কত দিন ধরে থাকবে। এর প্রভাবটা কেমন হবে। তবে এখানে একটা দিক হলো, আগে তো আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। এখন অনেকে অনেক কিছু জানে। একটা অভিজ্ঞতা তো হয়েছে। মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় হয়তো এতটা ক্ষতি হবে না। আবার ভ্যাকসিনজাতীয় কিছু একটা হয়তো অচিরেই আসবে। তাই সব কিছু মিলিয়ে হয়তো সামনের যে ধাক্কাটা, সেটা আগের মতো ক্ষতি করবে না বলে আমার মনে হয়।

কথা হলো বাংলাদেশে তো অর্থনীতিটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আসলে এ পথটা অনেক বন্ধুর পথ। সরকার স্টিমুলাজ (প্রণোদনা) প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু একই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে প্যাকেজ কিন্তু অনেকেই পায়নি। অনেক উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাদ রয়ে গেছে। এখনো স্টিমুলাজ প্যাকেজের অর্থ বিতরণ বাকি রয়ে গেছে। যত দূর জানি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পাঁচ ভাগের এক ভাগও এখনো বিতরণ করা হয়নি। সুতরাং এদিক থেকে চিন্তা করলে আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

আরেকটা বিষয় হলো যে আমরা হয়তো রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের এখন পর্যন্ত হয়তো একটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখছি, কিন্তু সেটা সামনের দিনে কতটুকু কন্টিনিউ করে সেটা নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর।

আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে আমাদের, সেটা হলো ম্যাক্রো ইন্ডিকেটর। ধরুন, যে প্রচুর মানুষ কাজ হারিয়েছে, পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে, অনেকে ঋণী হয়ে গেছে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হয়তো সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে গেছে, অনেকে হয়তো আরলি ম্যারেজ করাতে (সন্তানদের) বাধ্য হয়েছে, ছেলে ও মেয়ে বাচ্চাটাকে হয়তো আর কোনো দিন স্কুলে পাঠাতে পারবে না। এই যে ঘটনাগুলো ঘটছে, অ্যাডজাস্টমেন্ট করার জন্য এগুলো কিন্তু ম্যাক্রো ইন্ডিকেটর অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স—ওই সংখ্যাগুলোর ওপর প্রতিফলিত হয়। মনে রাখতে হবে যে সরকারের নীতি সহযোগিতা বা স্টিমুলাজ সহযোগিতা যেমন খাতভিত্তিক হতে হবে, তেমনি দরিদ্র মানুষের জন্যও কিন্তু সরকারের সহযোগিতা কন্টিনিউ থাকতে হবে। এ দিকটাতেই আমি জোর দিতে চাচ্ছি।

লেখক : গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা