kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রথম নির্বাচনী বিতর্ক

ট্রাম্পের ‘উগ্রতায়’ এগিয়ে বাইডেন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



 ট্রাম্পের ‘উগ্রতায়’ এগিয়ে বাইডেন

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন

চরম তিক্ততা, কদর্য ভাষা ও ঘৃণা ছড়িয়ে প্রথম বিতর্কের ৯০ মিনিট সময় পার করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন। মঞ্চে প্রাধান্য বিস্তার করাই ছিল রিপাবলিকান প্রার্থী ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য; সমর্থকদের দৃষ্টিতে যা ছিল ‘আলো ছড়ানো’। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘আলো নয়’, ‘আগুন’ ধরিয়েছেন ট্রাম্প; যে আগুনে পুড়েছেন তিনি নিজেই। দর্শক ও বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করে, বিতর্কে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন; ট্রাম্পের দৃষ্টিতে যিনি ‘ঢিলা জো’ অথবা ‘ঘুমন্ত জো’।

৭৪ ও ৭৭ বছর বয়সী দুই ‘তরুণ’ গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল সাড়ে ৭টা) বিতর্কের মঞ্চে ওঠেন। করোনাভাইরাস সতর্কতার জন্য হাত মেলানোর প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত ছিল আগে থেকেই। তবে দর্শক সারিতে বসা ট্রাম্প পরিবারের কোনো সদস্যের মুখে মাস্কও দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। এদিন অবশ্য কোনো দর্শককে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। হাজির ছিলেন শুধু দুই প্রার্থীর পরিবার ও প্রচারশিবিরের অল্প কয়েকজন কর্মকর্তা।

শুরু থেকেই মারকুটে ভঙ্গিতে অবতীর্ণ হন ট্রাম্প। চার বছর হোয়াইট হাউসে কাটানো সাবেক টিভি তারকা ‘ট্রাম্পোচিত’ ভঙ্গিতে ভাসা-ভাসা অতিকথন, দোষারোপ আর তথ্য ছাড়াই তত্ত্ব দিয়ে বাইডেনকে ধরাশায়ী করার চেষ্টা চালিয়ে যান। বাইডেনের বক্তব্যের মাঝখানে ট্রাম্প এতবার এবং এত বেশি নাক গলানোর চেষ্টা করেছেন যে একপর্যায়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বলতে বাধ্য হন, ‘আপনি কি চুপ করবেন? বিষয়টি একেবারেই প্রেসিডেন্টসুলভ নয়।’

২০১২ সালে শেষবার এ ধরনের মঞ্চে দেখা গিয়েছিল বাইডেনকে। সেবার ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে বিতর্ক করেছিলেন। অনেকেই তাঁর পাণ্ডিত্য, বিচক্ষণতার নজির দেন। তাঁর ধৈর্যও উদাহরণ দেওয়ার মতোই। এই বাইডেনও গতকাল ট্রাম্পের আচরণে বিরক্ত হয়ে তাঁকে ‘ভাঁড়’, ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করেন। এ-ও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট আপনি!’ এনবিসি টেলিভিশনের হিসাবে, বিতর্কের পুরো সময় ট্রাম্প মোট ৭৩ বার বাইডেনের বক্তব্যের মধ্যে কথা বলেছেন।

‘নিকৃষ্ট প্রেসিডেন্ট’ অপবাদের জবাব দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি গত ৪৭ মাসে যা করেছি, আপনি ৪৭ বছরেও (বাইডেনের রাজনৈতিক জীবন) তা পারেননি।’ বিতর্কে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের নিন্দা জানানোর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। ‘প্রাউড বয়েজ’ নামের একটি কট্টর ডানপন্থী গ্রুপকে নিন্দা জানানোর কথা সঞ্চালক ফক্স নিউজের অভিজ্ঞ সাংবাদিক ক্রিস ওয়ালেস তুললে ট্রাম্প জানান, তিনি এদের সমর্থন করেন। ৯০ মিনিটের একই বিতর্ক ১৫ মিনিট করে ছয়টি স্লটে বিভক্ত ছিল। এই ছয় স্লটে প্রার্থীদের অতীত, সুপ্রিম কোর্ট, করোনাভাইরাস, বর্ণবাদ, নির্বাচনী অখণ্ডতা ও অর্থনীতি নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরেন দুই প্রার্থী।

ওহাইয়োর ক্লিভল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কের একটা বড় সময়জুড়ে ছিল করোনাভাইরাস প্রসঙ্গ। এই ভাইরাসে দুই লক্ষাধিক আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। বাইডেন দাবি করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্টের অব্যবস্থাই এত মৃত্যুর জন্য দায়ী। এখনো তিনি সতর্ক না হলে মৃত্যুর মিছিল থামবে না। ট্রাম্প অবশ্য মনে করেন, তাঁর ত্বরিত ব্যবস্থার কারণে মৃতের সংখ্যা এত কম। তিনি আশা করেন, অক্টোবরের শেষ নাগাদ টিকা চলে আসবে। যদিও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ডিসেম্বরের আগে তেমন সম্ভাবনা নেই। ট্রাম্প অবশ্য স্বীকার করেন, টিকার বিষয়টি অনেকখানি রাজনৈতিক।

বিতর্ক শুরু হয় সুপ্রিম কোর্ট ইস্যু দিয়ে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ হাতে রেখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে অ্যামি কোনি ব্যারেটের মনোনয়ন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘নির্বাচনে আমরা জিতেছি। তাঁকে বেছে নেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে।’ ব্যারেটকে বেছে নেওয়ার ফলে সুপ্রিম কোর্টে রিপাবলিকানদের সুস্পষ্ট প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এ সময় ট্রাম্প সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টকে বামঘেঁষা বলেও অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, বাইডেন তাঁর দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থী হিসেবে পরিচিত স্যান্ডার্সের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। এর জবাবে বাইডেন বলেন, স্যান্ডার্সকে পরাজিত করেই তিনি বিতর্কের মঞ্চে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘এখন, ঠিক এই মুহূর্তে আমিই ডেমোক্রেটিক পার্টি।’

ব্যক্তিগতভাবেও বাইডেনকে আক্রমণ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘বাইডেনের ছেলে মাদকাসক্ত এবং এ কারণেই নৌবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন তিনি। বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তাঁর কোনো চাকরিও ছিল না।’ এর জবাব দিতে গিয়ে বাইডেন আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলে বিউ মারা গেছে। ওর কথা কেউ খুব একটা জানে না। ইরাক যুদ্ধ করেছে। ও জাতীয় বীর। ছোট ছেলে হান্টারের মাদকের সমস্যা ছিল; যেমন দেশের অনেকের আছে। ট্রাম্পের নিজের পরিবারেই আছে। তবে ও সেটা কাটিয়ে উঠেছে।’

বাইডেন এ সময় বলেন, ‘ট্রাম্প যা বলছেন তা সোজাসাপ্টা মিথ্যা। আমি এখানে তাঁর সত্য-মিথ্যা যাচাই করার জন্য আসিনি। সবাই জানে তিনি মিথ্যাবাদী।’ সিএনএন পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ২৯ শতাংশ ভোটার মনে করেন ট্রাম্প সত্য বলছেন। আর বাইডেনের ক্ষেত্রে এমন ধারণা, ৬৯ শতাংশ ভোটারের। বিতর্কে জলবায়ু সম্পর্কে একই রকম অবজ্ঞা আবারও দেখান ট্রাম্প। দম্ভ ছড়িয়ে দাবি করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটা ভালো কখনোই ছিল না।’

বিতর্ক শেষে সিএনএন, এনবিসি ও বিবিসি জানায়, প্রথম বিতর্কে জয়ী হয়েছেন বাইডেন। সিএনএনের সমীক্ষায় বাইডেন এ ক্ষেত্রে পেয়েছেন ৬০ শতাংশ দর্শকের রায়। ট্রাম্প ২৮ শতাংশের। কিন্তু ভোটে কি আদৌ প্রভাব ফেলবে এই বিতর্ক? এ নিয়ে দুই সংবাদমাধ্যমের যৌথ সমীক্ষায় সাড়া দিয়ে ৪৪ শতাংশ ভোটার বলছেন, ‘একেবারেই না।’ যেমন ফেলেনি ২০১৬ সালে। সেবার প্রথম দফা বিতর্কে জয়ী হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু চূড়ান্ত ভোটে জয় পান ট্রাম্প। সূত্র : বিবিসি, গার্ডিয়ান, সিএনএন, এনবিসি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা