kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের ব্যবহার কমাতে উদ্যোগ নেই

ডালডায় ৪৫% পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাট থাকে, উন্নত বিশ্বে ২% এর বেশি ব্যবহার নিষিদ্ধ

মাসুদ রুমী   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের ব্যবহার কমাতে উদ্যোগ নেই

মুখরোচক বেকারিপণ্য, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বিস্কুট, চানাচুর, চিপস, বার্গারসহ তেলে ভাজা অনেক কিছু এ প্রজন্মের নিত্যদিনের খাবার। আর এসব খাবারে লুকিয়ে আছে ট্রান্সফ্যাট নামের ‘নীরব ঘাতক’, যা হৃদরোগে মৃত্যুর বড় কারণ। ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে এই ডালডার ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো খাবার সংরক্ষণের সুবিধার্থে, বিভিন্ন ভাজাপোড়া ও বেকারি খাদ্যপণ্যের স্বাদ, ঘ্রাণ ও স্থায়িত্ব বাড়াতে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল ব্যবহার করে। চিকিৎসক ও গবেষকরা চর্বি ও ট্রান্সফ্যাটকে হৃদরোগের জন্য দায়ী করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) সম্প্রতি ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ যে ১৫টি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে, এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ট্রান্সফ্যাটের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে ডাব্লিউএইচও ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী খাদ্য থেকে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট নির্মূলকে অগ্রাধিকার দিলেও বাংলাদেশে এখনো এটি নিয়ন্ত্রণে কাজই শুরু হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের তথ্য মতে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪১.৩ শতাংশ। দেশে প্রতিবছর হৃদরোগে যে দুই লাখ ৭৭ হাজার মানুষ মারা যায়, এর ৪.৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট। এই ট্রান্সফ্যাটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি নিষিদ্ধ করা কিংবা নির্ধারিত মাত্রায় নিয়ে আসার দাবি উঠেছে। কিন্তু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো নীতিমালা না হওয়ায় কিছু করতে পারছে না সরকারি সংস্থাগুলো। দ্রুত সব ধরনের ফ্যাট, তেল ও খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকার পিএইচও নমুনার ৯২ শতাংশে ডাব্লিউএইচওর সুপারিশ করা ২ শতাংশ মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পিএইচও নমুনায় সর্বোচ্চ ২০.৯ গ্রাম পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, যা ডাব্লিউএইচওর সুপারিশ করা মাত্রার তুলনায় ১০ গুণের বেশি।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ব্যবহৃত ডালডায় ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাট থাকে। ডালডা ছাড়াও ভাজাপোড়া খাদ্যে একই ভোজ্য তেল উচ্চ তাপমাত্রায় বারবার ব্যবহারের ফলে খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট সৃষ্টি হয়। সাধারণত খরচ কমানোর জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁয় শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, জিলাপি, চিকেন ফ্রাইসহ ভাজাপোড়া খাবার তৈরির সময় একই তেল বারবার ব্যবহার করা হয়। এ কারণে এসব খাবারে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির দৈনিক ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত মোট খাদ্যশক্তির ১ শতাংশের কম।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিপার্টমেন্ট অব ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ১০টি বিস্কুট পরীক্ষা করে সেগুলোতে ৫ থেকে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভাজাপোড়া, বিস্কুট, চানাচুর, চিপস বা এ ধরনের অসংখ্য অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এটাই ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগের কারণ।’

এই গবেষণায় যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে অতি দ্রুত পিএইচওর ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এর মাধ্যমেই বাজারজাত প্রসেসড খাবারে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুসরণ করে ভারত, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলসহ অনেক দেশ খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে নীতি করেছে। বাংলাদেশেও দ্রুত এই নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।’ 

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচওর বাজার ছিল দুই লাখ ৪২ হাজার টন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মোট বাজারের প্রায় ৭ শতাংশ। গবেষণার আওতায় ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বেকারি ও রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে সচরাচর ব্যবহৃত হয় এমন চারটি শীর্ষস্থানীয় পিএইচও ব্র্যান্ডের (পিওর, পুষ্টি, সেনা ও তীর) তালিকা করা হয়। এই তালিকার ভিত্তিতে পাইকারি বাজার এবং পিএইচও উৎপাদনকারী কারখানা থেকে ব্র্যান্ডগুলোর মোট ২৪টি নমুনা সংগ্রহ করে ট্রান্সফ্যাটি এসিড মাত্রা নির্ণয় করা হয়। গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম পিএইচও নমুনায় গড়ে ১১ গ্রাম ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে। অন্য একটি গবেষণায় ঢাকার স্থানীয় বাজার থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে সংগৃহীত ১২ ধরনের বেকারি বিস্কুটের নমুনায় ৫ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, যা ডাব্লিউএইচওর সুপারিশ করা মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

সব ধরনের ফ্যাট, তেল ও খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। পাশাপাশি সহায়ক পদক্ষেপ হিসেবে মোড়কজাত খাবারের পুষ্টিতথ্য তালিকায় ট্রান্সফ্যাটের সীমা উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা, উপকরণ তালিকায় পিএইচওর মাত্রা উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে সারা বিশ্ব একত্র হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই। খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ এমন এক সাশ্রয়ী পদক্ষেপ, যা একই সঙ্গে হৃদরোগজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস, অসংক্রামক রোগ সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩.৪ অর্জনে সহায়তা করবে।’

ভোক্তা অধিকার সংগঠনের (ক্যাব) প্রগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আহম্মদ একরামুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে কোনো নীতি না থাকায় ভোক্তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ট্রান্সফ্যাট নির্মূল করতে সরকার, ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’

ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে কোনো আইন নেই। তবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া আছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিভিন্ন পণ্যের লেবেল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি একটি পজিশন পেপার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মনজুর মোর্শেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির আওতায় এরই মধ্যে ট্রান্সফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণে একটি ধারণাপত্র তৈরি করা হয়েছে। আমরা একটি নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা