kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রথম মামলায় সাহেদের যাবজ্জীবন সাজা

► ৭০টি মামলার মধ্যে অস্ত্র মামলার রায় হলো
► ধুরন্ধর ব্যক্তিদের জন্য দৃষ্টান্ত : আদালত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রথম মামলায় সাহেদের  যাবজ্জীবন সাজা

আলোচিত রিজেন্ট গ্রুপ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ এ রায় ঘোষণা করেন।

করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষায় জালিয়াতি ও প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার সাহেদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর মধ্যে প্রথম রায় দেওয়া হলো অস্ত্র মামলায়।

এমএলএম ব্যবসা থেকে শুরু করে নানা রকম জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলার খবর ঢেকে রেখে নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভিভিআইপিদের মাঝে হাজির হতেন রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ। অংশ নিতেন টেলিভিশনের টক শোতে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা অসংখ্য সেলফি ফেসবুকে দিয়ে নিজেকেও তিনি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দেখাতে চাইতেন।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাহেদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা বেরিয়ে আসতে থাকে। তাঁর বিরুদ্ধে সারা দেশে ৭০টির বেশি মামলা রয়েছে। এর বেশির ভাগই প্রতারণার অভিযোগে করা।

৩০ জুলাই করা অস্ত্র মামলাটির অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। আর আগস্টের শেষের দিকে সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। সেপ্টেম্বরে আট কার্যদিবস শুনানি শেষে আদালত এই রায় দিলেন। অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ধারায় যাবজ্জীবন এবং (চ) ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে। দুটি সাজা একত্রে চলবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া যে গাড়ি থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে, তার মালিকানা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘সাহেদ ২০ লাখ টাকা লোন নিয়ে গাড়িটি ক্রয় করেন, কিন্তু তিনি আদালতের কাছে অস্বীকার করেন। এমনকি সব কিছু জানা সত্ত্বেও আদালতের কাছে মিথ্যা তথ্য দেন। তিনি অত্যন্ত চালাক ও ধুরন্ধর ব্যক্তি।’

আদালত আরো বলেন, ‘গাড়িতে অস্ত্র রাখা প্রমাণিত হওয়ায় তিনি আদালতের কাছে কোনো অনুকম্পা পেতে পারেন না। আমাদের এই সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশে অনেক লোক রয়েছে, এই মামলার রায় তাদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।’

এর আগে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় সাহেদকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসে পুলিশ। এ সময় তাঁকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতের গারদখানায় রাখা হয়। এরপর দুপুর ১টা ৫৭ মিনিটে তাঁকে এজলাসে হাজির করা হয়। দুপুর ২টায় বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। ২টা ৮ মিনিটে বিচারক চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে ঢাকা মহানগর আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু সাংবাদিকদের বলেন, আদালত সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট। এ ছাড়া এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে যত প্রভাবশালী হোক তাঁকে আইনের আওতায় আসতে হবে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মনিরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামি সাহেদ ন্যায়বিচারবঞ্চিত হয়েছে। আমরা আগেই আশঙ্কা করেছিলাম, এত দ্রুত বিচার চলার কারণে ন্যায়বিচার পাব না। সেটা রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো।’ তিনি জানান, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকা অবস্থায় গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে রিজেন্ট হাসপাতালের জালিয়াতির বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াসহ নানা অভিযোগে ৭ জুলাই সিলগালা করে দেওয়া হয় উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়। এরপর পালিয়ে যান সাহেদ। করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করা হাসপাতালগুলোর একটি ছিল রিজেন্ট হাসপাতাল, কিন্তু ওই হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা না করেই রোগীদের ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর পরই জানা যায়, ওই হাসপাতালের লাইসেন্স ছিল না।

গত ১৫ জুলাই সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তিনি বোরকা পরে নৌকায় করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এরপর গত ১৯ জুলাই তাঁকে নিয়ে উত্তরায় অভিযানে যায় ডিবি পুলিশ। সেখানে সাহেদের গাড়ির ভেতর থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করা হয়।

প্রতারণার মাধ্যমে সাহেদ বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন বলেও র?্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য দিতে একটি হটলাইন খোলা হয়।

অস্ত্র মামলায় গত ২৭ আগস্ট সাহেদের বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন করেন। আদালত সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন। এরপর ধারাবাহিক সাক্ষ্যগ্রহণ চলে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২০ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা