kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পর্যটন খাত জুড়ে শুধুই ব্যর্থতা

মাসুদ রুমী   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পর্যটন খাত জুড়ে শুধুই ব্যর্থতা

প্রতিবেশী নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান ৪০ শতাংশ। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে সংখ্যাটা নেহাতই না বলার মতো, ২.২ শতাংশ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার গুরুত্ব দিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল; কিন্তু বাস্তবায়ন চিত্রে সেই গুরুত্বের প্রতিফলন নেই। এমনকি একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নেই লেগে যাচ্ছে সাত থেকে আট বছর, তা-ও অনিশ্চিত।

দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা (ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান) তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১৫ সালে। জাতীয় পর্যটন পরিষদের সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শুরু হয় চিঠি চালাচালি। অবশেষে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পরামর্শক নিয়োগে ২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে আইপিই গ্লোবাল লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। কিন্তু করোনাভাইরাসের অজুহাতে এই কাজও নির্ধারিত সময়ে (২০২১ সালের ৩০ জুন) শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পর্যটন খাতে এশিয়ার অন্য দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশের পর্যটন খাতে এখনো শম্বুকগতি। অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জিডিপিতে এই খাতের অবদান এখনো ৩ শতাংশের নিচে। সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটনের যথেষ্ট প্রতিফলন না থাকা, পর্যটনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, আমলান্ত্রিক জটিলতা, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দুর্বল অবকাঠামো এবং খাতটিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় দেশের পর্যটনশিল্প এগোতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বরং ২০১৬ সালে পর্যটন বর্ষে ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক আনার ঘোষণা দিয়ে না পারার মতো ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশেরজিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান ২.২ শতাংশ। এই খাতের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান ১.৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মোট কর্মসংস্থানের ৩.৮ শতাংশ অবদান এসেছে পর্যটন খাত থেকে। অন্যদিকে নেপালের মতো দেশে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৪০ শতাংশের বেশি। 

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং সৈকতে বিদেশি পর্যটকদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন (বিশেষ পর্যটন পল্লী)। এতে অর্থ সহায়তার ব্যাপারে ২০০৯ সালের ৩০ জুন সরকারের সঙ্গে আইডিবির চুক্তি হয়। এ জন্য ১৩৫ একর সৈকতসহ আশপাশের অতিরিক্ত আরো এক হাজার ১৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে অগ্রগতি সামান্য।

বিটিবির গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য ও পর্যটন বিশ্লেষক জামিউল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এত দিনেও একক পর্যটন আইন, ন্যাশনাল ট্যুরিজম ডাটাবেইস, টিএসএ (ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট), কিউটিএস (কোয়ালিটি ট্যুরিজম সার্ভিস), প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও গবেষণা সেল করতে পারিনি। সারা পৃথিবীতে পর্যটন চলে পর্যটনের নিয়মে আর আমাদের পর্যটন চলে আমলাদের ইচ্ছায়। ফলে এতে না আছে ব্যবস্থাপনা, না আছে কোনো শৃঙ্খলা। মহাপরিকল্পনার আশায় থেকে স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনাও যথাযথ বাস্তবায়িত হচ্ছে না।’

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, ‘পর্যটন খাতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে আমরা একটি টাকাও পাইনি। মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েও সদুত্তর মেলেনি। ছোট ছোট ট্যুর অপারেটর তাহলে কিভাবে টিকে থাকবে?’

বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান জার্নি প্লাসের নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তৌফিক রহমান বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানকে বলা হয় পর্যটনের বাইবেল, যা আরো ২০ বছর আগে হওয়া উচিত ছিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমাদের সব কিছু বুঝতে সময় লেগে যায়। আর বাস্তবায়ন হতে লাগে আরো বেশি সময়।’

পর্যটন খাতের উন্নয়নে নেওয়া কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, ‘পর্যটনের উন্নয়নে কিছু করতে গেলে আমরা দেখেছি ১৯টি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা আছে। মহাপরিকল্পনা তৈরি করতে গিয়ে আমরা নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছি। তবে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা পর্যটন খাত নিয়ে বেশি সচেতন।’

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘পর্যটন খাতের উন্নয়নে ধীরগতির নানা কারণ আছে। সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে আমাদের কাজ করতে হয়। তবে আমরা টানেলের শেষ প্রান্তে আলো দেখতে পাচ্ছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা