kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঢাকার চার নদী মরছে বর্জ্যে

শাখাওয়াত হোসাইন ও তানজিদ বসুনিয়া   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকার চার নদী মরছে বর্জ্যে

ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যে বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে এর চারপাশের নদীগুলো। সুদীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে নদীকে কেন্দ্র করেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং বিদেশি বণিকদের আসার অন্যতম কারণও ছিল ঢাকার নৌপথ। ১৬১০ সালে ঢাকা রাজধানী হিসেবে মর্যাদা লাভ করার পর এই অঞ্চলের নৌপথের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কিন্তু দখলের পাশাপাশি বর্জ্যের কারণে ৪০০ বছরের বেশি সময়ের এই ঢাকার চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু এবং টঙ্গী খালের বাঁচা-মরা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) নদী দখলদারদের উচ্ছেদে জোরালো অভিযান পরিচালনা করছে, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কঠিন বর্জ্য এবং পয়োবর্জ্যে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর অস্তিত্ব সংকট তৈরি করেছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও টঙ্গী খালের ৪০০টি পয়েন্ট দিয়ে কঠিন বর্জ্য পড়ছে পানিতে। এ ছাড়া ৩৬০টি পয়েন্ট দিয়ে পয়োবর্জ্য পড়ছে ওই সব নদীতে। সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসা কঠিন বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের দায়িত্বে থাকলেও নদীদূষণের কোনো দায় তারা নিতে চায় না।

ঢাকার চারপাশের চারটি নদীসহ সারা দেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে সরকারের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার নামে একটি নদী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। নদী সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ও মানুষের মধ্যে নদী ভাবনা তৈরি করতে আগামীকাল রবিবার আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস।

গবেষণার তথ্য বলছে, বুড়িগঙ্গা নদীর ২৩৭টি পয়েন্ট দিয়ে গৃহস্থালি ও শিল্প বর্জ্য এবং ২৫১টি পয়েন্ট দিয়ে পয়োবর্জ্য সরাসরি নদীর পানিতে পড়ছে। এ ছাড়া তুরাগের ৮৪টি পয়েন্ট দিয়ে কঠিন বর্জ্য এবং ৪৮টি পয়েন্ট দিয়ে পয়োবর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। আর ৩২টি পয়েন্ট দিয়ে কঠিন বর্জ্য এবং ১০টি পয়েন্ট দিয়ে পয়োবর্জ্য পড়ছে বালু নদীতে। এর বাইরে ৪৭টি পয়েন্ট দিয়ে কঠিন ও শিল্প বর্জ্য এবং ৫১টি পয়েন্ট দিয়ে পয়োবর্জ্য টঙ্গী খাল নামের নদীটিতে ফেলা হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, পুরান ঢাকা থেকে লোহার ব্রিজ পর্যন্ত জায়গায় বহু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া বহু আগে থেকে ওই এলাকায় নদী তীরে গড়ে উঠেছে বাজার। এসব প্রতিষ্ঠান ও বাজারে উত্পন্ন বর্জ্যের বড় একটা অংশ এখনো সিটি করপোরেশনের সংগ্রহের বাইরে থেকে যায়। এসব বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। এ ছাড়া হাজারীবাগ থেকে বাবুবাজার এলাকার লোকজন রাতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়। বুড়িগঙ্গার দুই পারে তৈরি পোশাক কারখানা এবং নানা ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাপড়ের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হয়।

এদিকে গাবতলী ব্রিজ থেকে খোলামোড়া ঘাট হয়ে বছিলা হাউজিং পর্যন্ত এবং ঢাকা উদ্যান থেকে আমিন বাজার ব্রিজ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি তুরাগ নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পালপাড়া ঘাট, বড়বাজার এবং দিয়াবাড়ী এবং সিন্নিরটেক থেকে আশুলিয়া ল্যান্ডিং স্টেশন পর্যন্ত বহু পয়োবর্জ্যের লাইন যুক্ত করা হয়েছে তুরাগে। কর্দা থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত এলাকায়ও রয়েছে স্যুয়ারেজ লাইন। 

আব্দুল্লাহপুর খাল থেকে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান পর্যন্ত টঙ্গী খালের দুই পারে বহু পয়োবর্জ্য লাইন রয়েছে। টঙ্গী ব্রিজ থেকে পাগাড় শ্মশানঘাট পর্যন্ত এলাকায়ও রয়েছে স্যুয়ারেজ লাইন। ঢাকার নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পানির জলাধার হিসেবে ধরা হয় টঙ্গী খালের পানিকে। নীলা মার্কেট থেকে ইছাপুরা বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাজারের বর্জ্য ফেলা হয় বালু নদীতে। নদীটির বালুপার থেকে ডেমরা ও সুলতানা কামাল ব্রিজ পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়েও বর্জ্য ফেলা হয় নদীর পানিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ওয়াসা। সিটি করপোরেশনের অব্যবস্থাপনা এবং জনগণের সচেতনতার অভাবে কঠিন বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদীতে ফেলা বেশির ভাগ স্যুয়ারেজ লাইন ঢাকা ওয়াসার। তবে নদী তীরে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্যুয়ারেজ লাইনও নদীর সঙ্গে যুক্ত আছে। স্যুয়ারেজ লাইন নিয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের জন্য গত বছরের ৩ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের ওপর উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। তবুও সংস্থাটি স্যুয়ারেজ লাইনের দায় নিতে চায় না।

জানতে চাইলে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরেজমিন পরিদর্শন ও জিপিএস ব্যবহার করে কঠিন বর্জ্য এবং স্যুয়ারেজ লাইনের পয়েন্টগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। নদীকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে না পারলে সরকারের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন কঠিন হবে। যেসব স্যুয়ারেজ লাইনের খোঁজ পেয়েছি তার বেশির ভাগ ঢাকা ওয়াসার। তবে বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরও রয়েছে।’

তবে স্যুয়ারেজ লাইন বন্ধ করতে এরই মধ্যে ঢাকা ওয়াসা কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৫৬টি লাইন আমরা বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।’

তবে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পানি বেড়ে যাওয়ায় কাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তাকসিম এ খান আরো বলেন, ‘কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। কাজ চলছে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আব্দুল্লাহপুরের দিকে বস্তিবাসী এবং নিম্নবিত্ত মানুষজন এখনো বর্জ্য নদীতে ফেলছে। তবে এই বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা সভা করেছি। খুব শিগগির ভ্যান সার্ভিস চালু করা হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা