kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আপসরফায় অবস্থান টলেছে খালেদার

অনেকের মতে, এতে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিএনপির কিছুটা রাজনৈতিক ক্ষতিও হয়েছে

এনাম আবেদীন   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আপসরফায় অবস্থান টলেছে খালেদার

সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্থান কোথায় হবে—এমন আলোচনা এখন শুধু বিএনপির ভেতরে নয়, বাইরেও ছড়িয়েছে। এর কারণ হলো, নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার জন্য এক ধরনের ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। কিন্তু সেই খালেদা জিয়াই এখন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে কারামুক্ত হয়ে গুলশানের ‘ফিরোজা’য় আছেন। দূরে আছেন তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেও। কবে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন, সেটি দলটির কোনো নেতাকর্মীর জানা নেই।

এমন পরিস্থিতির কারণেই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ডালপালা মেলছে। অনেকের মতে, ওই ঘটনায় খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিএনপির কিছুটা রাজনৈতিক ক্ষতিও হয়েছে। কারণ খালেদা নমনীয় হয়েছেন। আবার কারো মতে, যে প্রক্রিয়ায়ই হোক, কারামুক্তিও এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। তা ছাড়া দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না হতে পারলেও অন্তত নেতাকর্মীদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার যোগাযোগের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।

তা ছাড়া খালেদা জিয়া বা বিএনপির রাজনীতির উত্তরাধিকার ২০১৬ সালে দলটির জাতীয় কাউন্সিলেই নির্ধারিত হয়েছিল। অনেকের মতে, সমঝোতায় রাজি হওয়ার ক্ষেত্রে ওই ঘটনাও প্রভাব ফেলেছে। ওই বছর কাউন্সিলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদ তৈরি করে পুত্র তারেক রহমানকে ওই পদে বসানো হয়। পাশাপাশি দলটির গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বলা হয়, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। সে অনুযায়ী তারেকই এখন দল পরিচালনা করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, ‘সমঝোতার মধ্য দিয়ে মুক্তি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং এ রকম কম তাৎপর্যহীন ঘটনা দিয়ে ইতিহাসে স্থান নির্ধারণ হয় না। তা ছাড়া পলিটিকস ইজ অ্যান আর্ট অব কম্প্রমাইজ। রাজনীতিতে সব সময় সমঝোতার ইতিহাস রয়েছে।’

উদাহরণ দিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য অনেক সংগ্রাম করেও অং সান সু চিকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়েছে। ২৭ বছর কারাভোগের পর ক্ষমতায় গিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ না নিয়ে সমঝোতা করেছেন। তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তা ছাড়া কারাগার থেকে খালেদা জিয়ার বের হওয়াটাও এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, ‘বিএনপিকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করার জন্য একজন রাজনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়া সফল। কিন্তু সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তির কারণে নীতির প্রশ্নে খালেদা জিয়ার যে দৃঢ় অবস্থান বা আপসহীন ইমেজ ছিল, সেটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ইতিহাসে স্থানটা বোধ হয় তিনি না-ও পেতে পারেন।’ 

নেলসন ম্যান্ডেলা ও চে গুয়েভারার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘নীতির প্রশ্নে তাঁদের দুজনেরই অবস্থান ছিল ডু অর ডাই। নীতির সিদ্ধান্তে অটল থেকে জীবনকে উৎসর্গ না করলে ইতিহাসে স্থান পাওয়া কঠিন।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, ‘ঐতিহাসিকরা খালেদা জিয়াকে যেভাবে উপস্থাপন করবেন, জায়গা তাঁর সেভাবেই হবে। তবে এটা ঠিক যে জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করলেও খালেদা জিয়া এটাকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। যেমন এখনকার আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নয়।’ সমঝোতা করে কারামুক্তির ঘটনায় বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসই এর বিচার করবে। তবে এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।’

সরকারের নির্বাহী আদেশে কারামুক্ত হয়ে গত ২৫ মার্চ থেকে গুলশানের ফিরোজায় আছেন খালেদা জিয়া। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দুই দফার আবেদনে মোট এক বছরের জন্য তাঁর সাজা স্থগিত করা হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে একটি দুর্নীতি মামলায় সাজা হলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হয়। কিন্তু আড়াই বছরে কিছুটা চেষ্টা সত্ত্বেও বিএনপি বা দলটির নেতৃত্বাধীন কোনো জোট তাঁর কারামুক্তি ইস্যুতে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি গত নির্বাচনের সময়েও তাঁকে কারামুক্ত করতে ব্যর্থ হয় দলটি। নির্বাচনের পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ করে সম্মতি পাওয়ার পরই কারামুক্তির জন্য আবেদন করা হয়। কৌশলগত কারণে বিএনপি নেতারা ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হননি বলে জানা যায়।

তবে পরিবারের আবেদনের আগে নব্বইয়ের আন্দোলনে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তিসহ খালেদা জিয়ার ৩৬ বছরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের কথা বিবেচনা করে দলের ভেতর ও বাইরে আলোচনা ছিল যে খালেদা জিয়া সহজে নমনীয় হবেন না। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এক-এগারো পরবর্তী সময়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘটনা রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার কঠোর মনোভাবের বিষয়টি জনমনে আবারও স্পষ্ট হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষক মহলের অনেকে মনে করেন।      

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য মনে করেন, ‘বিএনপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে সুসংগঠিত করা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে খালেদা জিয়ার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।’

কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সমঝোতা বিএনপি চেয়ারপারসন করেননি, করেছে তাঁর আত্মীয়রা। কারণ উনি তো একবারের জন্যও বলেননি আমাকে বের করো। তা ছাড়া করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকারও তাঁকে কারামুক্ত করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল।’ ‘তা ছাড়া পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুসারী বড় একটি রাজনৈতিক দল রেখে গেলে ইতিহাস তাঁকে কখনোই ফেলতে পারে না। এ দেশের রাজনীতিতে বিএনপি আজও সবচেয়ে জনপ্রিয় দল।’ বলেন মির্জা ফখরুল।

অনুসারী বা বড় কোনো রাজনৈতিক দল রেখে না যাওয়ায় গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে পরিচিত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো জাতীয় নেতাকে দেশে আজকাল স্মরণ করা হয় না। এমনকি তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু দিবসও ঠিকমতো পালিত হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্থান কী হবে, সেটি ভবিষ্যৎ বাস্তবতা বলে দেবে। তবে এটি ঠিক যে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার অনুসারী বড় রাজনৈতিক দল থাকায় তাঁদের স্মরণ করা লোকের অভাব হবে না।’

প্রসঙ্গত, অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতিষ্ঠিত সর্বশেষ দলের নাম ছিল এনডিএফ। ১৯৬৩ সালে তিনি লেবাননের বৈরুতে একটি হোটেলে তিনি মারা যান। পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকও জীবনের শেষ দিকে কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা ছিলেন। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮২ বছর বয়সে তিনি মারা যান। মৃত্যুর দুই বছর আগে ১৯৭৪ সালে মওলানা ভাসানী হুকুমত-ই-রব্বানী তরিকার প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর বছর ১৯৭৬ সালে তিনি ‘খুদায়ে খিদমতগার’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিলেন। এসব সংগঠনের এখন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা