kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ইউএনও আক্রান্ত

হামলায় রবিউল একাই

আদালতে জবানবন্দি

দিনাজপুর প্রতিনিধি   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হামলায় রবিউল একাই

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তাঁর বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলা একাই চালিয়েছেন রবিউল ইসলাম। এ ঘটনার একমাত্র পরিকল্পনা ও হামলাকারী রবিউল নিজেই। আক্রোশ থেকেই এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন ইউএনওর বাসার মালি (সাময়িক বরখাস্ত) রবিউল। গতকাল রবিবার নিজের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রবিউল দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেওয়ায় ওই হামলার বিষয়ে আর কারোর কোনো দায় নেই। মামলার অভিযোগপত্রে রবিউল ছাড়া আর কাউকে আসামি করা হবে না। ফলে এর আগে গ্রেপ্তার হয়ে র‌্যাবের কাছে ওই হামলার দায় স্বীকার করা যুবলীগ সদস্য আসাদুল ইসলাম, রংমিস্ত্রি নবিরুল ইসলাম, সান্টু কুমার ও নৈশ্যপ্রহরী পলাশ আজ সোমবার আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হতে পারেন।

গতকাল বিকেলে আদালত থেকে বের হয়ে রবিউলের স্বীকারোক্তির বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি ইমাম জাফর। তিনি বলেন, আসামি নিজে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার সম্মতি জানালে তাঁকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। পরে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আবেদনসহ তাঁকে দিনাজপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৭-এ নেওয়া হয়। আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইসমাইল হোসেনের কাছে আসামি রবিউল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রবিউলের দেওয়া তথ্য মতে হামলায় ব্যবহার করা হাতুড়ি, লাঠি, মই, চাবিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে তাঁর পরনের প্যান্ট, হাতের ছাপসহ মোবাইল ফোনের লোকেশন তথ্য ও আলামত হিসেবে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এসব আলামত বিচারকাজে সহায়ক হবে।

এর আগে দুই দফায় ৯ দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল সকালে রবিউলকে আদালতে নেওয়া হয়। জবানবন্দি নেওয়ার পর বিকেলে  রবিউল ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর রবিউলকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ।

স্বীকারোক্তি নিয়ে পুলিশ যা বলেছে :  পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রবিউল ১৬১ ধারায় পুলিশের কাছে বলেছেন, ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি জেলা প্রশাসকের ‘ফরাস’ পদে চাকরিতে যোগ দেন। তবে তিনি মালির কাজ করতেন। গত ১ ডিসেম্বর তাঁকে ঘোড়াঘাটে বদলি করা হয়। সেখানেও তিনি মালির কাজই করতেন। ঘোড়াঘাটে চাকরির দেড় মাসের মাথায় রবিউল ইউএনওর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেন। পরে ভাইদের সহযোগিতায় তিনি ওই টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন।  গত ১৫ জানুয়ারি ইউএনও রবিউলের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দিলে ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত এবং বিভাগীয় মামলা করা হয়।

পুলিশের কাছে ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনার তিনটি কারণ উল্লেখ করেন রবিউল। প্রথম কারণ ইউএনওর ব্যাগ থেকে তিনি ১৬ হাজার টাকা চুরি করেছিলেন, কিন্তু তিনি পরিশোধ করতে বাধ্য হন ৫০ হাজার টাকা। ওই সময়ে তিনি ইউএনওকে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। তার পরও শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ—চাকরি করার সময় তিনি ১৭ হাজার টাকা বেতন পেতেন। কিন্তু সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর তাঁর বেতন হয়ে যায় ৯ হাজার টাকা। পাশাপাশি ক্রিকেট জুয়ায় আসক্ত থাকাসহ বিভিন্ন কারণে তিনি ধারদেনার সমস্যায় পড়েন। আর তৃতীয় কারণ—গত এক মাস আগেও রবিউল ঘোড়াঘাটে গিয়ে তাঁর অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে আসেন ইউএনও ও তাঁর বাবার কাছে। কিন্তু তাতেও তাঁর প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখানো হয়নি। এসব কারণেই ক্ষোভ বা আক্রোশ থেকে তিনি হামলার পরিকল্পনা করেন।

যেভাবে হামলা : ঘটনার দিন রাত ১টা ১৮ মিনিটের দিকে রবিউল ইউএনওর বাসভবনের প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় নৈশপ্রহরী নাদিম হোসেন পলাশের কক্ষে গিয়ে কলাপসিবল ও মেইন গেটের চাবি খুঁজে না পেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। পরে গোলঘরে একটা চেয়ার নিয়ে ইউএনওর কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে ব্যর্থ হয়ে মই নিয়ে আসেন। মই সেট করার আগেই সেখানে একটা বাল্ব জ্বলছিল। সেটা সুইচ টিপে বন্ধ করেন এবং বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। তখন রাত ৩টা ৩১ মিনিট। বাইরে থেকে বাথরুমের দরজা বন্ধ থাকায় তিনি সহজে বেডরুমে ঢুকতে ব্যর্থ হন। আধাঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে সিটকিনি খুলে তিনি ইউএনওর বেডরুমে ঢোকেন। এ সময় ইউএনও ওয়াহিদা টের পেয়ে বিছানা থেকে উঠতে গেলে পেছন থেকে তাঁর মাথায় হাতুড়ি দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন রবিউল। তাঁর চিৎকারে পাশের রুম থেকে বাবা ওমর আলী শেখ এগিয়ে আসতেই তাঁকেও ধাক্কা মেরে ফেলে দেন রবিউল। দরজার চৌকাঠের সঙ্গে ধাক্কা লাগায় তাঁর বাবাও পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারছিলেন না। রবিউল একপর্যায়ে আলমারির চাবির কথা বললে ওমর আলী শেখ চাবি রাখার স্থান বলে দেন। রবিউল চাবি নিয়ে আলমারি খোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে রাত প্রায় শেষ। ফজরের আজানের শব্দ পেয়ে ইউএনওর ব্যাগ থেকে একটি ৫০ হাজার টাকার বান্ডিল নিয়ে ৪টা ৩১ মিনিটে বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে আসেন রবিউল।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা