kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার

জাতিসংঘ জেনোসাইড ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আজ বাংলাদেশ নিজেই দুর্ভোগে পড়েছে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক    

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাতিসংঘ জেনোসাইড ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জেনোসাইড ঠেকাতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। গতকাল শনিবার বিকেলে ‘রোহিঙ্গাদের টেকসইভাবে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি এবং সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে তাঁরা এই মন্তব্য করেন।

ওয়েবিনারে বাংলাদেশ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফিলিপাইনের আলোচকরা যোগ দেন। অস্ট্রেলিয়ার সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, কানাডার লরেনটিয়ান ইউনিভার্সিটি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি), আশা ফিলিপিন্স ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিআরআই), কানাডার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টার ডিসিপ্লিনারি রিসার্চ ইন ল, সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড পলিসি, অন্টারিও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ওআইডিএ) ওই ওয়েবিনার আয়োজন করে।

অস্ট্রেলিয়ার কমিউনিটি সেফটি অ্যান্ড মাল্টিকালচারাল অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জেসন উড বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অস্ট্রেলিয়া তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ ও সমন্বয় করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, শুধু মানবিক কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। হাজার হাজার রোহিঙ্গার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন বাংলাদেশই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের কারণে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার এ পর্যন্ত মাত্র ছয় হাজার রোহিঙ্গাকে ‘মিয়ানমারের বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকার করেছে। ক্ষতিপূরণের জন্য সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি টেকসই সমাধানের ব্যাপারেও তিনি জোর দেন।

পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ২০১৭ সালে গণবাস্তুচ্যুতির তিন বছর পরও রোহিঙ্গারা এখনো দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। তাদের বোঝা বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তিনি বলেন, জবাবদিহি এককভাবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করবে না। মিয়ানমার সহজে ছেড়ে দেবে, এমন লক্ষণও কম। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ও নজরেও মিয়ানমারের রাখাইনে বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা বন্ধ হয়নি। এর আগে হামলাকারী বাহিনীর কাছে সুরক্ষা আশা করা যায় না। তাই তিনি মিয়ানমারে সেফ জোন ও করিডর প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন।

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ নজিরবিহীন চাপে আছে। এই সংকট স্থিতিশীলতার জন্যই শুধু নয়, রাজনৈতিক ঝুঁকিও।

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. সুফিউর রহমান বলেন, গত তিন বছরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো মো. শহীদুল হক বলেন, মিয়ানমার সরকার ও জনগণ সংখ্যালঘুদের শান্তিপূর্ণ জীবন চায় না। আইসিজের নির্দেশনা সত্ত্বেও কোনো অগ্রগতি নেই। চীনের সমর্থনে চেষ্টা করেও কোনো উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, জেনোসাইড বন্ধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আইসিজেতে রায় আসার পরও একটি দেশ কিভাবে না শুনে থাকতে পারে? এখন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মাথা তুলে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি আইসিজেতে রোহিঙ্গাদের আরাকানের মুসলমান বলেছেন। যদি তা-ই হয়ে থাকে তবে তাদের আরাকানে থাকতে হবে। তিনি ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যালায়েন্সকে মিয়ানমারের সঙ্গে অংশীদারি বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করারও তাগিদ দেন।

ইন্টারন্যাশনাল ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট ডিন নিকোল জার্জু বলেন, ঐতিহাসিকভাবে আসিয়ান মানবাধিকারের জোরালো সমর্থক নয়। বরং তারা বাইরের হস্তক্ষেপের বিষয়ে একমত।

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আরাকান রোহিঙ্গা ইউনিয়নের মহাপরিচালক ড. ওয়াকার উদ্দিন বলেন, প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস্তবায়নে দেরি করার কৌশল অবলম্বনে মিয়ানমার সরকার বেশ সফল। নাগরিকত্ব আইন সংশোধন না করলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট ইয়াসমিন উল্লাহ বলেন, মিয়ানমারের জেনোসাইড বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আছে। বিচারিক কাঠামো যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারে তাহলে কী লাভ? বিশ্ব কবে আর জেনোসাইড ঠেকাতে জেগে উঠবে?

সুইনবার্ন বিজনেস স্কুলের সিনিয়র লেকচারার ড. মহসিন হাবিব বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন ও দুর্ভোগের মাত্রা এত ব্যাপক যে যত টাকাই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক না তা যথেষ্ট হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারকে জবাদিহির আওতায় আনতে চাই। যতটা আনতে পারব মিয়ানমার ততই চাপে পড়বে।’

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ফিলিপ রুডক রোহিঙ্গাদের ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেন, অন্য কোথাও হলে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাত।

আইনি সেবা প্রতিষ্ঠান ফলিহগ, এলএলপির সদস্য অ্যান্ড্রু বি লোয়েনস্টেইন বলেন, আইসিজে বলেছেন যে মিয়ানমার ব্যর্থ হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসে গাম্বিয়া আইসিজেতে প্রতিবেদন জমা দেবে। ৯ মাস পর আবার মিয়ানমার দেবে। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন দ্বিতীয় দফায় শুনানি হবে কি হবে না। তিনি বলেন, আদালত ক্ষতিপূরণ, প্রতিকারও নির্ধারণ করে দিতে পারেন।

ওয়াশিংটন ডিসিতে সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির পরিচালক ড. আজিম ইব্রাহিম বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অর্থ দিচ্ছে। গাম্বিয়া রোহিঙ্গাদের আইনি অধিকার পাওয়ার দরজা খুলে দিয়েছে। অন্য দেশগুলোরও এগিয়ে আসা উচিত।

যুক্তরাজ্যের বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, জবাবদিহির জন্য সত্যিকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত।

২০১৮ সালের হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ডি ওয়াং ওয়াং নু রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব, সম্মানজনক জীবন ও ভূমির অধিকার দাবি করেন।

লরেনটিয়ান ইউনিভার্সিটির আইন ও বিচার বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক হেনরি পোলার্ডের সঞ্চালনায় সমাপনী পর্বে আইডিইবি প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী এ কে এম এ হামিদ, আশা ফিলিপিন্স ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইও কামরুল এইচ তরফদার এবং অন্টারিও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির পরিচালক নেভিল হেওয়াগ বক্তব্য দেন।

মন্তব্য