kalerkantho

শনিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৭। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জোচ্চুরিতে পিছিয়ে নেই পূর্বাঞ্চলও

দালান ঘষামাজাতেই দুই কোটি ৬২ লাখ টাকা

মানিক আকবর   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দালান ঘষামাজাতেই দুই কোটি ৬২ লাখ টাকা

দুই কোটি ৬২ লাখ টাকায় সংস্কার করা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেলওয়ে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক অফিসের আরঅ্যান্ডআই ডিপো ভবন। ছবি : সংগৃহীত

পশ্চিমাঞ্চলের চেয়ে জোচ্চুরিতে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে একাধিক খাতে পূর্বাঞ্চলের কর্তারাও সরকারের কোটি কোটি টাকা পকেটে পুরেছেন। সরকারি টাকা লোপাটে অভিনব সব কায়দা বেছে নিয়েছিলেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এমনই সব ফিকিরের তথ্য উঠে এসেছে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনে। ওই অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন খাতে সরকারের কত কোটি টাকা তছরুপ করেছেন, এর হিসাব কষতে রীতিমতো ঘাম ঝরেছে নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের। এর পরও কত কোটি টাকা নয়ছয় হয়েছে সেটার সঠিক অঙ্ক নিরীক্ষা কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে পারেনি। এ থেকেই অনুমান করা যায় দুর্নীতির মাত্রা কতটা ভয়াবহ ছিল।

যেমন—১৮৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৭ ফুট প্রস্থের এক কক্ষের টিনশেড ভবন মেরামতে যে টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে, তা শুনে যে কারোরই চক্ষু চড়কগাছ হবে। দুই কোটি ৬২ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৭ টাকা! ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অফিসের আরঅ্যান্ডআই শাখার ওই টিনশেড ভবনের পূর্তকাজের জন্যই এত টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। ওই কাজের জন্য সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে ৫৪টি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে পূর্তকাজের মালপত্র সরবরাহের বিপরীতে দু্ই কোটি ৬২ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৭ টাকার বিল পরিশোধও করা হয়েছে। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা চুক্তিপত্র ও বিল ভাউচার বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, ওই কক্ষ মেরামতকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন অনেক দ্রব্য সরবরাহের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। প্রতিটি দ্রব্য বাজারদরের চেয়ে  চার-পাঁচ গুণ বেশি ধরে প্রাক্কলন ও দাম পরিশোধ করা হয়েছে। ওই কক্ষের মেরামত কাজটি ওয়ার্কস-সংক্রান্ত হওয়ায় রেলওয়ের প্রটোকল অনুসারে ইঞ্জিনিয়ারিং কোডের ৯০১ এবং প্রকৌশল বিভাগ প্রণীত শিডিউল অব রেইট/২০১৩ অনুযায়ী দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরি করে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে ওয়ার্কস-সংক্রান্ত কাজ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে শেষ করা হয়েছে। পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে লাভবান হওয়ার জন্য এভাবে কাজটি করে সরকারি বিপুল অঙ্কের টাকা তছরুপ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এদিকে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী (কারখানা) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম ও আসবাব কিনেছেন। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে চার লাখ সাত হাজার ৩২ টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম) রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তর ওই অর্থবছরে রেলওয়ের শিডিউল দরের চেয়ে বেশি দামে মালপত্র কিনে বিল পরিশোধ করেছে। এতে এক কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার ৪৫৭ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত রেলওয়ের শিডিউল অব রেইটস অনুসরণ না করে কেনাকাটা শেষ করা হয়েছে।

আলাদা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (চট্টগ্রাম) ছয় হাজার ৫০০ টাকা দামের এলইডি টানেল লাইট প্রতিটি ক্রয় করেছেন ২৭ হাজার ৭৪০ টাকা দরে। একটি ডুয়েল ক্লিপস এলইডি ফিটিং ল্যাম্পের প্রকৃত দাম ছয় হাজার ৫০ টাকা। তা কেনা হয়েছে প্রতিটি ১৪ হাজার ২৮৮ টাকায়। এলইডি টানেল লাইট ৯০টি এবং এলইডি ফিটিং ল্যাম্প কেনা হয়েছে ৫০টি। এই খাতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ২০ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩২ টাকা।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিভিন্ন মেশিনারিজ মালপত্র, স্টোন ব্যালাস্ট, লিফটিং জ্যাক, রেল ড্রিলিং মেশিন ইত্যাদি বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনায় আর্থিক ক্ষতি করেছে দুই কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৪ টাকা। বিভিন্ন মেশিনারিজ মালপত্র কিনে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৭৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৪ টাকার। স্টোন ব্যালাস্ট কিনে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬০ লাখ ১০০ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি লিফটিং জ্যাকের প্রকৃত বাজারদর ১৮ হাজার ৬৮৮ টাকা। এর প্রতিটি কেনা হয়েছে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টাকা দরে। এভাবে পাঁচটি লিফটিং জ্যাক কেনা হয়েছে।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সিলিং ও এগজস্ট ফ্যান কিনে ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭০ টাকা লোপাট করা হয়েছে। প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে এই দুই ধরনের ফ্যান। সিলিং ফ্যান কেনা হয়েছে ১৭০টি। এগজস্ট ফ্যান কেনা হয়েছে ৬০টি। একটি সিলিং ফ্যানের প্রকৃত বাজারদর ছয় হাজার টাকা, তা কেনা হয়েছে ১৪ হাজার ৪৭০ টাকা দরে। একইভাবে একটি এগজস্ট ফ্যানের দাম বাজারে এক হাজার ২৫০ টাকা, তা কেনা হয়েছে আট হাজার ৪০০ টাকা দরে।

গত অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে অতিরিক্ত দামে ৮১৬ কেজি গ্যাস কিনে আর্থিক ক্ষতি করেছে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৬ টাকা। প্রতি কেজি ৭৩০ টাকা দামের গ্যাস কেনা হয়েছে দুই হাজার ৪৪৮ টাকা কেজি দরে। এভাবে মোট ৮১৬ কেজি গ্যাস কেনা হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৬ টাকা।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের কোচের এসি মেরামতের জন্য বিভিন্ন মালপত্র কেনা হয়। এ ক্ষেত্রেও প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে মাল কেনায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯০০ টাকা। তিনটি ফটোকপি মেশিন কিনতে গিয়েও দামের গরমিল করা হয়েছে। প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দরে কেনার কারণে ক্ষতি হয়েছে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৪৭৫ টাকা। প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে কেনা হয় এই ফটোকপি মেশিনগুলো। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা হয়েছে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে এক কোটি আট লাখ ২২ হাজার ৮১০ টাকা।

এ ছাড়া আরো বেশ কিছু সামগ্রী কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ ব্যাপারে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছরের কেনাকাটা ও অন্য কোনো বিষয় আমার জানার কথা নয়। ওই সময় আমি এখানে ছিলাম না। আমি এসেছি পাঁচ-ছয় মাস হলো। অডিটের কোনো কপিও আমি দেখিনি। আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। তা ছাড়া কেনাকাটার কথা যদি বলেন, সরকারি কেনাকাটায় ভ্যাট ও আনুষঙ্গিক খরচ নিয়ে রেট একটু বেশিই হয়।’

২০১৮-১৯ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন গোলাম আম্বিয়া। বর্তমানে তিনি অবসরকালীন ছুটিতে আছেন। কালের কণ্ঠ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা