kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মসজিদে বিস্ফোরণ

অবৈধ গ্যাসও বিদ্যুৎ লাইন দায়ী

মসজিদ কমিটিরও অবহেলা

নিজস্ব প্রতিবেদক ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অবৈধ গ্যাসও বিদ্যুৎ লাইন দায়ী

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ জমে থাকা গ্যাস। মসজিদটি নির্মাণের সময় গ্যাসের পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগের রাইজার থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে মসজিদের ভেতর জমে যায়। ঘটনার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প অবৈধ লাইনটি চালু করলে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় এবং এতে বিস্ফোরণ হয়। ভয়াবহ ওই ঘটনা তদন্ত করে গতকাল বৃহস্পতিবার তিতাস কর্তৃপক্ষ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ ঘটনার জন্য তিতাস, ঢাকা পাওয়ারডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ও মসজিদ কমিটির গাফিলতিকে দায়ী করেন। একই কথা বলেছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিও। এই কমিটির প্রতিবেদনে ভবন নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অব্যবস্থাপনা এবং মসজিদের সামনের রাস্তা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবহেলার বিষয়টিও এসেছে। অনিয়ম রোধে ১৮টি সুপারিশও করেছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে এশার নামাজের সময় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হন ৪২ জন। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আরো পাঁচজন এখনো হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিউ) চিকিৎসাধীন।

বিস্ফোরণের ঘটনায় গত শনিবার মসজিদ পরিচালনা কমিটি, তিতাস গ্যাস ও ডিপিডিসির অবহেলাকে দায়ী করে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির। দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারার এ মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি জরিমানা বা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

মসজিদ কমিটির অভিযোগ, গ্যাস লিকেজের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে লিকেজ মেরামত করতে তিতাস গ্যাস থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়া হয়। তাঁরা ঘুষের টাকা জোগাড় করতে পারেননি বলে গ্যাস লিকেজ মেরামত করা যায়নি।

বিস্ফোরণের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি ও সিটি করপোরেশন পৃথক পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির গণশুনানিতে ৪৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ডিপিডিসি মসজিদের সামনে থেকে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও একটি খুঁটি সরিয়ে নিয়েছে।

বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিতাস গ্যাস মসজিদের পূর্ব ও উত্তর পাশের সড়কের পুরো মাটি খুঁড়ে পরিত্যক্ত পাইপলাইনে ছয়টি ছিদ্র দেখতে পায়। এ ঘটনায় তিতাসের চার কর্মকর্তাসহ আটজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তিতাসের তদন্ত প্রতিবেদন : তিতাসের তদন্ত কমিটি গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কমিটির প্রধান তিতাস গ্যাস ঢাকা কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) আবদুল ওয়াহাব তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরেন।

আবদুল ওয়াহাব বলেন, ‘তিতাস গ্যাসের নিয়ম-কানুন না মেনে, অবহিত না করে গ্রাহক তাদের নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে তাদের রাইজারগুলো স্থানান্তর করেছে। এটা ১৯৯৮ সালের ঘটনা আর আমাদের এই লাইনগুলো ১৯৯৬ সালে দুর্ঘটনাস্থলের নিচে বসানো ছিল, তারা আমাদের লাইনের নিচে দিয়ে বেইসমেন্ট করেছে। এ ছাড়া ২০০০ সালে নিয়ম না মেনেই মসজিদ স্থাপন করে। মসজিদটি তৈরি করার সময়ই তারা লাইনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

তিতাসের জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারবে না তিতাস-ডিপিডিসি। মসজিদ কমিটির অবহেলাও প্রমাণিত হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘দুর্নীতি নেই, এটা বলব না। দুর্নীতি আছে বলেই সব বিভাগে অব্যবস্থাপনাটা রয়ে গেছে। অব্যবস্থাপনার কারণেই অনেক কিছু আমাদের চোখের আড়ালে ঘটে যায়। আমি মনে করি, পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। আমরা আরো ভালোর দিকে যেতে চাই।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন : গতকাল বিকেল ৫টায় নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিনের কাছে ৪০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি।

এ সময় জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরপরই সেটি গতকাল সন্ধ্যায় আমি নিজে মন্ত্রিপরিষদসচিবের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। সেটির আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

খাদিজা তাহেরা ববি বলেন, ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদনে তিতাস, বিদ্যুৎ ও মসজিদ কমিটির গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করেছি। কেননা, আমরা তদন্তে জানতে পেরেছি, মসজিদের ভেতরে গ্যাসের উপস্থিতি ছিল এবং সেই জমে থাকা গ্যাসে বৈদ্যুতিক স্পার্কের মাধ্যমে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।’

প্রতিবেদন দাখিল করার সময় কমিটির সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ টি এম মোশারফ হোসেন, ডিপিডিসির পূর্ব বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোরশেদ, ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন, তিতাসের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মফিজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা