kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অনিরাপদ স্বাভাবিকতায় সায় নেই বিশেষজ্ঞদের

তৌফিক মারুফ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনিরাপদ স্বাভাবিকতায় সায় নেই বিশেষজ্ঞদের

চীনের উহানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার প্রায় আড়াই মাস পরে বাংলাদেশে আসে করোনা। এই ভয়াবহ ভাইরাস মোকাবেলায় এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেওয়া হতে থাকে একের পর এক নির্দেশনা। কখনো সমন্বিতভাবে, আবার কখনো আলাদাভাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও তাঁর ভাষণে দেন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এরই এক পর্যায়ে দেশের প্রথম সারির একদল চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্যবিদ, রোগতত্ত্ববিদ ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠন করা হয় করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। কিন্তু তাঁদের সব পরামর্শ গ্রহণ করা হয় না বলে ক্ষোভ রয়েছে কমিটির অনেক সদস্যের মধ্যে।

কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। সদস্যসচিব করা হয় আইইডিসিআরের তৎকালীন পরিচালক ও বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে। কমিটির এ পর্যন্ত সভা হয়েছে ১৬টি; যেখান থেকে এসেছে অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। তবে কমিটির অনেক সদস্য প্রায় প্রতিটি সভায়ই ক্ষোভ দেখান তাঁদের পরামর্শ বা সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই কার্যকর না হওয়ায়।

কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পরামর্শ যদি কার্যকর করা না হয় তবে আমাদেরকে কমিটিতে রেখে লাভ কি? আমরা চাই মানুষের জীবন-জীবিকাসহ সব কিছুই স্বাভাবিক হোক, কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে, শারীরিক দূরত্ব ভুলে গিয়ে, মাস্ক না পরে আমরা সব কিছু স্বাভাবিক করে দেব। এমন অনিরপদ বা অরক্ষিত স্বাভাবিকতার সময় এখনো আসেনি। ফলে এতে আমাদের সায় থাকতে পারে না।’ এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘এখন সংক্রমণ অনেকটা কমেছে। কিন্তু মৃত্যু কমছে না। শনাক্তের হার এখনো ১০-১২-তে আছে, এটা ৫ শতাংশের নিচে নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে আমরা নিজেদের ন্যূনতম নিরাপদ ভাবতে পারছি না। আর ওই পর্যায়ে এমনি এমনি যাওয়া যাবে না। গণপরিবহন, অফিস-আদালত, পথ-ঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্যক্ষেত্রে মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য হয়, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে কঠোরভাবে।’

অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘আমাদের দেশে ইতালি ও চায়নিজ স্টাইলে লকডাউনের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। এটা এখন প্রমাণিত যে আমাদের দেশের মতো পরিবেশে মানুষকে বাঁশ দিয়ে আটকে কিংবা জোর করে তালাবন্দি করে এ ধরনের মহামারি রোধ করা যায় না। প্রয়োজন সব কিছু স্বাভাবিক রেখেই টেস্ট জোরালোভাবে চালু রাখা, শনাক্তরা যাদের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছে তাদের খুঁজে বের করা। আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা এখনো জরুরি। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, এসব কাগজে-কলমে নির্দেশনায় থাকলেও বাস্তবে এখন কিছুই হচ্ছে না।’

বিশেষজ্ঞ কারিগরি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সভা করে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকি। মাঝেমধ্যেই সরকারের তরফ থেকে আমাদেরকে ডেকে পরামর্শ জানতেও চাওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, অনেক পরামর্শই আর বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না বা কার্যকর করার মতো পদক্ষেপ দেখি না। এমনকি আমরা ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প অনেক পরামর্শও দিয়ে থাকি, যাতে একটি না করা গেলে আরেকটি করা যায়; কিন্তু সেখানে হতাশা তৈরি হয়। যদিও এর মধ্যে বেশি কিছু পরামর্শ আবার কার্যকরও হয়েছে ভালোভাবেই। বিশেষ করে আমাদের পরামর্শ অনুসারে সরকার ভ্যাকসিন নিয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা খুবই ইতিবাচক। ইতিমধ্যে সরকারের উদ্যোগে কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভালোভাবেই যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।’

ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘এখন যেভাবে দেশের সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এটা কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ। সামনে পরিস্থিতি আবার যে খারাপ হবে না, সেই গ্যারান্টি কিন্তু কেউ দিতে পারছে না। ঝুঁকির মধ্যেই সব কিছু এভাবে স্বাভাবিক করার পক্ষে আমাদের মত নেই। আমরা এক দিন আগেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এটা জানিয়ে এসেছি। আমরা বলছি—মাস্ক পরতেই হবে, হাত বারবার ধুতেই হবে, দূরত্ব বজায় রাখতেই হবে। অন্ততপক্ষে এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করার জন্য সরকারের দিক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই।’

করোনায় করণীয় কী, সে বিষয়ে অনেক নির্দেশনাই আসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বশেষ যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেটাই কার্যকর আছে। আগের নির্দেশনাগুলো থেকে যেগুলো প্রয়োজন, সেগুলো সর্বশেষ নির্দেশনায় যুক্ত করা হয়েছে। তাই আগের নির্দেশনাগুলোর অপ্রাসঙ্গিক অংশ এমনিতেই বাতিল হয়ে গেছে।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে মাঠ প্রশাসনে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। স্থানীয়ভাবে সেগুলো মনিটরিংও হচ্ছে। এ ছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সচেতনতামূলক প্রচার, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আসা ব্যক্তিদের সচেতনতামূলক বার্তা বারবার দেওয়া এবং স্থানীয় সরকার বিভাগসহ জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে সব সময়ই গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তাঁদের নিয়ে বৈঠক করে অনেক সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি কেবল আমাদের হাতে নেই। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু সেগুলো কেন হচ্ছে না সেটা বোঝা মুশকিল।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, করোনা মোকাবেলায় শুধু যে যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুর্নীতির ঝড় বয়ে গেছে, তা ভাবলে ভুল হবে। জাতীয় কারিগরি কমিটির বাইরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে এই যে ডজন ডজন কমিটি করা হয়েছে, কমিটিগুলোর সুপারিশ নিয়ে যে কর্মযজ্ঞ হয়েছে, অসংখ্য ব্যয়বহুল পুস্তিকা-নির্দেশনা ছাপা হয়েছে, বিভিন্ন ডিজিটাল প্রচারণা হয়েছে, সেগুলোও খতিয়ে দেখা দরকার। অপ্রয়োজনে শুধু টাকার নয়ছয় করার কৌশল হিসেবে এটা-সেটার প্রকাশনা করা হয়েছে, তারও তদন্ত করা দরকার।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা