kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কি থেমে গেছে?

আবদুল্লাহ আল মামুন   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কি থেমে গেছে?

দেশে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য, টেন্ডারবাজিসহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযান শুরুর এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদের শাসনামলের শুরুতে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর এ অভিযান শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে ক্ষমতাসীন দলের ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা আটক হন, কিন্তু এক মাস না যেতেই ওই অভিযান গতি হারাতে শুরু করে। সমালোচনা এড়াতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান পরিচালনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। দুর্নীতিবিরোধী ওই অভিযান, বিশেষ করে দুর্নীতিতে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযান কার্যত দেখা যাচ্ছে না। এক বছর আগে যে অভিযান শুরু করা হয়েছিল সেটা থেমে গেছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। যদিও আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, এক বছর ধরে সরকার দুর্নীতিবাজ দলীয় নেতা ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে।

গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদচ্যুত করা হয়। ওই বৈঠকে শেখ হাসিনা ঢাকা মহানগর যুবলীগের দুই নেতার কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এরপর

১৮ সেপ্টেম্বর মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান হয়। ওই দিন গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে। এর দুই দিন পর যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া প্রভাবশালী ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৬ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয় তাঁদের গডফাদার হিসেবে পরিচিত যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে। একে একে কৃষক লীগ, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা অভিযানে ধরা পড়েন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে এ অভিযান সারা দেশের মানুষের বিপুল সমর্থন লাভ করে, কিন্তু এক মাস না যেতেই ওই অভিযান গতি হারাতে শুরু করে। সমালোচনা এড়াতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান পরিচালনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

অভিযান শুরুর পর ওই বছর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সফরে গিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওই অভিযান সরকারি দলের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ সময় গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনাও করেন তাঁরা। 

আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, অভিযানের অংশ হিসেবে যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার, সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথকে সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সহযোগী সংগঠন ছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যে কমিটি ঘোষণা করা হয়, সেখানেও বিতর্কিতদের বাদ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সরকারি দল আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ব্যাংক হিসাব তলব করে সম্পদের অনুসন্ধান করছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযান বন্ধের প্রশ্নই ওঠে না। সরকারের এমন কোনো সিদ্ধান্ত হলে আমি জানতে পারতাম।’ তিনি দাবি করেন, ওই অভিযান বন্ধের জন্য শুরু করা হয়নি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার থেমে নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেমে নেই। তিনি দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সব সময় কঠোর ভূমিকা পালন করে এসেছেন। কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। তাই দেশবাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর অবিচল আস্থা রেখেছে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি যে এর (অভিযানের) ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাক। আমরা সত্যিকার অর্থে গুড গভর্ন্যান্স, যেটা আমরা বলেছি আমাদের ঘোষণাপত্রে, আমরা এটা মিন করি, এটাই আমরা জাতির কাছে প্রমাণ করতে চাচ্ছি।’

কয়েক মাস আগে একটি হাসপাতালের পর্দা কেনা থেকে শুরু করে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বালিশ কেনা, করোনাভাইরাস মহামারির শুরুর দিকে চিকিৎসকদের জন্য প্রয়োজনীয় মাস্ক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ (পিপিই) কেনা এবং করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জেকেজির ডা. সাবরিনা চৌধুরী এবং রিজেন্ট হাসপাতালের মো. সাহেদের প্রতারণার সংবাদ ছিল সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়, যা সরকারকে বিব্রত করেছে।

সরকার ও আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক দাবি করেছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত তাঁদের কাউকেই ছাড় দেয়নি সরকার। ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সারা দেশে বিপুলসংখ্যক জনপ্রতিনিধিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিজে থেকেই সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অধিদপ্তরের কয়েকজন পরিচালককেও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা