kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ইওএনওর ওপর হামলা

রবিউল ছাড়া আর কারো কথা ভাবছে না পুলিশ

দিনাজপুর প্রতিনিধি   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রবিউল ছাড়া আর কারো কথা ভাবছে না পুলিশ

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের উপর হামলার ঘটনায় সাবেক মালি রবিউল ছাড়া আর কারো কথা ভাবছে না পুলিশ। একা রবিউলই এই ঘটনা ঘটিয়েছে- এই তথ্য নিশ্চিত করতেই পুলিশের তদন্ত এগুচ্ছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য হিসেবে বলা হচ্ছে, ভুল করে আক্রোশের বসে এমন ঘটনা ঘটায় সে।

অন্যদিকে রবিউল ইসলামই এই ঘটনার সাথে জড়িত-এমন দাবিটি কতটা সঠিক  তা নিয়ে কাজ করছে প্রশাসনিক একটি কমিটি।  তারা এই হামলার নেপথ্যে  অন্য কারণও রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন। ওই কমিটির একজন সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার যাবতীয় তথ্য, সিসি ফুটেজ ও আলামতসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা। প্রকৃত ঘটনা আড়াল  মামলার মোড় যাতে অন্য কোন দিকে যেতে না পারে সেজন্য সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।  সে কারণে র‌্যাব ও পুলিশের বক্তব্য যাই হোক তা  নিয়ে বিচলিত নন তারা। তিনি জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের প্রতি তাদের আস্থা আছে।  এরপরেও যোগসূত্রগুলো মিলিয়ে দেখছেন তারা। ওই রাতে  যারা হামলা চালিয়েছিল তারা আলমারির চাবি চাচ্ছিল বলে জানা গেছে। হামলা যদি আক্রোশের কারণে হয়ে থাকে তাহলে আলমারির চাবি নেয়ার উদ্দেশ্য কি সেটিও জানার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা পুরো ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ রেখেছেন।

রবিউল স্বীকারোক্তি হিসেবে যা বলা হচ্ছে: রবিউল স্বীকারোক্তি দাবি করে  পুলিশ বলছে, পারিবারিক অশান্তির মধ্যেও  চতুর্থ শ্রেণীর চাকরি থেকেও  সাময়িক ভাবে বরখাস্ত  হতে হয় রবিউলকে। চার মাস আগে ইউএনওর ব্যাগ থেকে ১৬ হাজার টাকা চুরি হয়। এই টাকা পরে তাকে ফেরত দিতে হয় ধার করা ৫০ হাজার টাকায়। সে  সময়ে তিনি তার বিরুদ্ধে যাতে বিভাগীয় ব্যবস্থা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হয় সেজন্য অনুরোধ করেছিলেন ইউএনওকে। কিন্তু  সে অনুরোধ রক্ষা হয়নি। সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর তাকে ১৭ হাজার টাকা বেতনের বদলে ৯ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছিল। যেটা দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়ে এবং ধারের টাকাও  শোধ করতে পারছিলেন না। সব কারণে ইউএনওর উপর হামলার পরিকল্পনা করে রবিউল ইসলাম।  

বুধবার গত ২ নিজের বাড়ী দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার  বিজোড়া গ্রামের ধামাহার ভিমপুর থেকে বিকাল ৪ টার দিকে ঘোড়াঘাটের উদ্দেশ্যে বের হন। দিনাজপুর ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি যাত্রীবাহি বাসে উঠে রাত ৯ টায় ঘোড়াঘাটে পৌঁছেন তিনি। ঘোড়াঘাট বাজারে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে রাত যখন ১টা ১৮ মিনিটে  ইউএনও বাসভবনের প্রাচীর  টপকে ভিতরে প্রবেশ করেন । প্রথমে নৈশ্য প্রহরী নাদিম হোসেন পলাশকে ফোন দেন। ফোন রিসিভ না হওয়ায় তার কক্ষে গিয়ে দেখে  সে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। পলাশের কক্ষে ইউএনও’র বাস ভবনের কেসিগেট ও মেইন গেটের তালা ঝুলানোর চাবি খুঁজতে থাকেন। চাবি না পাওয়ায় পলাশের কক্ষ থেকে বের হয়ে মালির দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় নিজের হাতে তৈরি পরিত্যক্ত কাঠ রাখার ঘরে রাখা  মই ও একটা চেয়ার নিয়ে ইউএনও’র বেড রুমে ঢুকে পড়েন। যখন রবিউল মালি পদে চাকুরী করতেন তখন সেই মই দিয়েই তিনি কবুতরের বাসা পরিস্কার করতেন। রবিউল নিজেই সেই মই তৈরি করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে প্রবেশ করার  জন্য চেয়ারের উপর মই রাখেন রবিউল।  মই দিয়ে উঠে ভেন্টিলেটর খুলে ভিতরে প্রবেশ করে তিনি দেখেন যে বেডরুমে না ঢুকে বাথরুমে ঢুকে পড়েছেন। বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা। তাই তিনি আর ইউএনওর ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি। বাথরুমেই রবিউল অপেক্ষা করতে থাকেন কখন ইউএনও প্রকৃতির ডাকে  সাড়া দিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করবেন। কিন্তু ঘন্টা দেড়েক অপেক্ষার পরও যখন ইউএনও বাথরুমে প্রবেশ করেনি তখন রবিউল আবার ভেন্টিলেটর দিয়ে মই বেয়ে নিচে নেমে আসেন।

এরপর ইউএনও’র বেড রুমের ভেন্টিলেটার বরাবর চেয়ার ও মই সেট করেন। সেখানে একটা বাল্ব জ্বলছিল তা সুইচ টিপে বন্ধ করেন। রাত ৩টা ৩১ মিনিটে ভেন্টিলেটর দিয়ে ইউএনও’র রুমে প্রবেশ করে। রুমে প্রবেশ করার সময় থপ করে একটি শব্দ হলে ইউএনও টের পেয়ে যান। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় বলেন,  ‘বাবা দেখতো কোন বেয়াদব রুমে ঢুকেছে।’ এই কথা বলার সাথে সাথে ইউএনও ওয়াহিদা খানম বিছানা থেকে উঠতে গেলে সাথে সাথে তার গালে ও মাথায় হাতুড়ি দিয়ে  পেটাতে থাকেন রবিউল। এক পর্যায়ে ইউএনও বিছানায় ঢলে পড়েন। ইউএনও’র  চিৎকারে পাশের রুম থেকে বাবা ওমর আলী  শেখ এগিয়ে আসা মাত্রই তাকেও ধাক্কা মেরে ফেলে দেন রবিউল। দরজার চৌকাঠের সাথে ধাক্কা লাগায় তার বাবাও পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারছিলেন না। এ সময়  কেন তার মেয়ের উপর হামলা করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের পাশাপাশি প্রহরী নাদিম হোসেন পলাশকে একাধিকবার ডাক দেন তিনি। রবিউল এক পর্যায়ে আলমারির চাবির কথা বললে ওমর আলী শেখ চাবি রাখার স্থান বলে দেন। পরে চাবি হাতে নিয়ে আলমারী খোলার চেষ্টা করলেও রবিউল আর আলমারী খুলতে পারেন না। এরই মধ্যে মনে হয় যে রাত শেষ  হতে যাচ্ছে। তখন রাত ৪টা ৪১ মিনিট। তাড়াতাড়ি করে তাদেরকে ফেলে রেখে আবার ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে আসেন রবিউল। প্রাচীর টপকিয়ে রাস্তা দিয়ে সোজা মহাসড়কে যান তিনি। এরপর ঢাকা থেকে দিনাজপুরের উদ্দ্যেশে  যাওয়া কোচে উঠে দিনাজপুরে চলে আসেন।

 মামলার তদন্তের সাথে যুক্ত ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার করার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে রবিউলই এই ঘটনার সাথে জড়িত। রবিউল ইসলামের বক্তব্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারে পাওয়া তথ্য মিলে যাওয়ায় পুলিশ বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত এই ঘটনার সাথে একজনই জড়িত। রবিউলের  দেয়া তথ্য অনুসারে ইউএনও’র  আলমারির চাবি এবং  হাতুড়িসহ বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা