kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

‘স্পুৎনিক-ভি’ বিজ্ঞানের চেয়ে রাজনীতি বেশি

ড. সমীর কুমার সাহা

১৪ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘স্পুৎনিক-ভি’ বিজ্ঞানের চেয়ে রাজনীতি বেশি

অনেক দেশে একরকম পাল্লা দিয়ে চলছে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া। তবে সবার আগে সেই স্বপ্ন জয়ের দাবি করেছে রাশিয়া। তারা বানিয়েছে ভ্যাকসিন ‘‘স্পুৎনিক-ভি’, যা একদিকে দেখাচ্ছে আশার আলো অন্যদিকে তর্কের জন্ম দিয়েছে দুরাশার। কী ভাবছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। তা জানতে কালের কণ্ঠ মুখোমুখি হয়েছিল অণুজীববিজ্ঞানী বাংলাদেশ চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিক মারুফ

 

কালের কণ্ঠ : রাশিয়ার ‘স্পুৎনিক-ভি’ নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী? আসলেই কি এটি করোনামুক্তির স্বপ্নজয় হিসেবে দেখছেন?

ড. সমীর সাহা : এককথায় বলতে গেলে বলব, না। এই উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত বিজ্ঞান নেই। বরং প্রশ্ন আছে বেশি। এমনকি অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের নকল করা হয়েছে বলেও কথা উঠেছে। দুটিই এডিনোভাইরাসকেন্দ্রিক। ব্রিটিশরা কিন্তু বলতে শুরু করেছে তাদের ফর্মুলা চুরির কথা। যদিও নকল হলে অসুবিধা নেই। মূলকথা নিরাপদ কি না, সেটা। সেখানেই তো সমস্যা। তবু আমি আশা করতে চাই, রাশিয়ার দাবি সত্যি হোক, মানুষ উপকৃত হোক, তবে নিরাপদভাবে।

 

কালের কণ্ঠ : বিজ্ঞান নেই, তার মানে কি বৈশ্বিক রাজনীতি বলে যে কথা উঠেছে, আপনিও কি তা-ই বলছেন?

ড. সমীর সাহা : হ্যাঁ, সে রকমই বলতে চাই। এর রাজনীতি। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সব ধাপ শেষ না করেই বাহবা নেওয়ার জন্য রাশিয়া এমন ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া একজন রাষ্ট্রপতি কেন এমন করে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের ঘোষণা দেবেন? এটা দেওয়ার কথা বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে। তার মানে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : রাশিয়া তো বলছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যেমন অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়, মানুষকে বাঁচানোর জন্য তাঁরাও সেটাই করছেন, তবে সমস্যা কোথায়?

ড. সমীর সাহা : সমস্যা এখানেই যে জরুরি অবস্থা হলেও তার একটা ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য পর্যায় থাকতে হবে। যেখানে যাদের মধ্যে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। সে জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের মধ্যে আগে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা উচিত ছিল চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগে। সেটা এখানে হয়নি। অল্প কিছু মানুষের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটা পর্যাপ্ত নিরাপদ বলে এখনো সন্দেহের বাইরে রাখা যাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিন্তু এখন পর্যন্ত এটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মত দেয়নি। বরং এটির কার্যকারিতা নিয়ে তারাও প্রশ্ন তুলেছে। সেটা কিন্তু এমনি এমনি নয়।

 

কালের কণ্ঠ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তো অনেক ক্ষেত্রেই খুব রক্ষণশীল থাকে, এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এমন রক্ষণশীল অবস্থাও কি ঠিক হচ্ছে?

ড. সমীর সাহা : মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়েই তাদের কাজ। ফলে তারা তো সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকবে এবং মানুষকে সতর্ক রাখবে, সেটাই হওয়া উচিত। তারা সেটাই করছে। যেমন তারা বারবার মানুষকে সতর্ক করছে এই বলে যে ভ্যাকসিন না-ও পাওয়া যেতে পারে। তার মানে সংস্থাটি মানুষকে সতর্ক রাখছে। সংস্থাটি যেকোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে টু দ্য পয়েন্টে যেতে চায় মানুষকে নিরাপদ রাখতে।

 

কালের কণ্ঠ : এত কম সময়ে রাশিয়ার ভ্যাকসিন আনার কারণেই কি বেশি প্রশ্ন উঠেছে?

ড. সমীর সাহা : সেটা তো অবশ্যই। যতই যুদ্ধকালীন অবস্থা হোক। ছয় মাসের আগেই একটি ভ্যাকসিন পূর্ণাঙ্গ আবিষ্কার হয়ে যাবে, সেটা কতটা বিজ্ঞানসম্মত, তা নিয়েই প্রশ্ন। এর পেছনে প্রতিযোগিতাটাই বড় হয়ে উঠেছে।

 

কালের কণ্ঠ : এই যে একেক দেশের ভ্যাকসিন নিতে বিভিন্ন দেশ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, বড় বড় বিনিয়োগ করছে, যদি এই ভ্যাকসিন শেষ পর্যন্ত সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন এই অর্থের কী হবে? তৈরি করা কোটি কোটি ডোজ ভ্যাকসিনের কী পরিণতি হবে?

ড. সমীর সাহা : এই খাতে বিনিয়োগটা এমনভাবেই হয়। যারা বিনিয়োগ করছে তারা সব কিছু জেনেশুনেই বিনিয়োগে নামছে। যদি ব্যর্থ হয় তবে উৎপাদিত সব ভ্যাকসিন নষ্ট করে ফেলা হবে। টাকার ক্ষতি হবে। সেটা সবাই মেনে নেবে। এ ছাড়া এই বিনিয়োগের পেছনে আরেক ধরনের বাণিজ্য আছে। অর্থাৎ যদি এই ভ্যাকসিন দ্রুত এসে যায় তবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা দেশের পক্ষে দ্রুত অন্যান্য বাণিজ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ফলে এই খাতে যা বিনিয়োগ হচ্ছে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি উপার্জনের পথ খুলে যাবে; জীবনযাপন ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। বেশির ভাগই সেই হিসাব কষে নেমেছে।

 

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের কী অবস্থান হওয়া উচিত আর কী করছে এই ভ্যাকসিন ইস্যুতে?

ড. সমীর সাহা : বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে আমি মনে করছি। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশ চীনের ভ্যাকসিনের জন্য কাজ করছে। সেই সঙ্গে আরো একাধিক দেশের বা উদ্ভাবনের দিকে নজর রাখছে। অর্থাৎ একটি পথ বন্ধ হলে বা ব্যর্থ হলে আরেকটি পথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটা খুবই দূরদর্শী ও পরিকল্পিত উপায় বেছে নিয়েছে বলে মনে হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের জন্য আরো কিছু সুবিধা আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি বা এই খাতের বড় দাতা সংস্থা বিল গেটস ফাউন্ডেশনের কাছে। তারা বাংলাদেশকে টিকার ক্ষেত্রে সব সময়ই গুরুত্বসহকারে দেখে। বিশেষ করে ইপিআইয়ের কারণে বাংলাদেশ ওই সব সংস্থার কাছে সমীহ আদায় করতে পেরেছে। ফলে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ যে অন্য দেশগুলোর চেয়ে দেরিতে ভ্যাকসিন পাবে, সেটা আমার কাছে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী হতেই পারি।

 

কালের কণ্ঠ : ধন্যবাদ আপনাকে।

ড. সমীর সাহা : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা