kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ অগ্রাধিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ অগ্রাধিকার

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে দেশে বাড়তি সংকট তৈরি করেছে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। ভয়াল ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ধাক্কাও সামলাতে হয়েছে। এসবের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আনার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো দরকার। দুর্নীতিও দেশের চলমান উন্নয়নের পথে বড় বাধা। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনেও রয়েছে জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। সার্বিক এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় এখন পাঁচটি।

মন্ত্রিসভার বৈঠকসহ বিভিন্ন সভায় সরকারি কর্মকর্তা ও নিজ দলের নেতাকর্মীদের তিনি যেসব নির্দেশনা দিচ্ছেন তা থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ৩৩ জেলা বন্যার পানিতে ভাসছে। ১৯৯৮ সালের পর এবারের বন্যাকে দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। চলমান বন্যা মোকাবেলার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দেখভাল করছেন। করোনা মোকাবেলায় সার্বক্ষণিক তদারকও করছেন তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের শূন্য সহনশীলতার অবস্থান বজায় রেখেছেন।

বন্যা মোকাবেলায় বিশেষ প্রস্তুতি : বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং নদীভাঙনে গৃহহারাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা এরই মধ্যে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মানুষের আবাসের বন্দোবস্ত করতে চলতি বাজেটে সরকার আলাদা বরাদ্দ রেখেছে বলেও জানান সরকারপ্রধান। বন্যায় যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছে তাদের ঘরবাড়ি করে দেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। বন্যার্তদের স্কুল-কলেজে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ নজর দিতে বলেছেন।

গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বন্যা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি যদি কোনো বন্যা আসে তাহলে সেটা দীর্ঘমেয়াদি থাকার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছেন পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণেরও। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা মোকাবেলায় দলীয় নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এবারের বন্যা সম্ভবত দীর্ঘ হতে পারে। ১৯৯৮ সালের বন্যা স্থায়ী ছিল ৬৯ দিন, অন্যদিকে ১৯৮৮ সালের বন্যা ছিল দুই সপ্তাহ। এবারের বন্যা যদি ১৯৯৮ সালের মতো দীর্ঘ হয়, তাহলে আমাদের কী করণীয়, সে ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।’ আরেকটি সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালে বন্যা মোকাবেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘ওই সময় অনেকেই বলেছিল যে দুই কোটি মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। আমরা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে কোনো মানুষ না খেয়ে মারা যায়নি।’

করোনার মধ্যেও বিদেশি বিনিয়োগ আনার তাগিদ : করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও বিদেশি বিনিয়োগ আনার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় করোনা সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের একটা ধাক্কা এসেছে, এটা ঠিক। আবার সুযোগও তৈরি হয়েছে। সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কাজেই কারা বিনিয়োগ করতে চান, সেদিকে লক্ষ রেখে সেই বিনিয়োগ যাতে আমাদের দেশে আসে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক দেশে এখন শিল্প-কারখানা বন্ধ। আমাদের জনসংখ্যা আছে, জমি তৈরি আছে, অন্য সুযোগ-সুবিধা আছে। এই সুযোগটায় আমরা কিন্তু বিনিয়োগ আরো বেশি আকর্ষণীয় করতে পারি এবং আনতে পারি।’ এই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

করোনা মোকাবেলায় সার্বক্ষণিক তদারকি : চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশেও এগিয়ে চলে নানা ধরনের প্রস্তুতি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর প্রথম দিকে নিজেদের মতো কাজ শুরু করলেও একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক তদারকি শুরু করেন। তাঁর কার্যকর নির্দেশনার মাধ্যমে চলতে থাকে বিভিন্ন পদক্ষেপ। দেশে একদিকে করোনায় সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, অন্যদিকে মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক করার জন্য সুপরিকল্পিত কর্মপন্থা নির্ধারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নানা দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। বিভিন্ন এলাকায় করোনা প্রতিরোধে কার্যকর দিকনির্দেশনা দেন। এ ছাড়া তাঁর দেওয়া ৩১ দফা নির্দেশনা অনুসরণ করেই দেশে চলছে সব ধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই : গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বলেন, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করেই ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে। কে কোন দলের, সেটি আমাদের কাছে বড় কথা নয়।’

পরের দিন স্বাস্থ্য খাতে বিগত ১০ বছরের দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে করোনা পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণা ও দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ এবং জেকেজি হেলথকেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরী ও তাঁর সহযোগী ডা. সাবরিনা বর্তমানে জেলে রয়েছেন।

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে সরকার গঠন করে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণেই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। গত বছর ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগে শুদ্ধি অভিযান প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ঘোষিত ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

মুজিববর্ষের উদ্যোগ : চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা দলীয় ও সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, একটি পরিবারও ঘরহীন থাকবে না। মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজও শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে আট লাখ ৮২ হাজার ৩৩টি পরিবার ঘরহীন অবস্থায় আছে। এর মধ্যে জমি আছে কিন্তু ঘর নেই এমন পরিবারের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫০টি। ঘর ও জমি দুটোই নেই দুই লাখ ৯২ হাজার ২৮৩ পরিবারের। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাদের ঘর নেই তাদের শুধু ঘর দেওয়া হবে। যাদের জমি এবং ঘর কিছুই নেই তাদের জমি কিনে বা খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়ে ঘর করে দেওয়া হবে। গড়ে প্রতি পরিবারে পাঁচজন হিসাব করলে এই উদ্যোগের মাধ্যমে মাথার ওপর ছাদ মিলবে ৪৪ লাখ ১০ হাজার মানুষের।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ঘর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রতিটি ঘরের সামনের দিকে পাঁচ ফুটের একটি বারান্দা থাকবে, দুটি বেডরুম, একটি রান্নাঘর ও একটি টয়লেট থাকবে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। দেয়াল ও মেঝে হবে ইটের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা