kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

মুখোমুখি অবস্থানে স্বাস্থ্য প্রশাসন চিকিৎসক

তৌফিক মারুফ   

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুখোমুখি অবস্থানে স্বাস্থ্য প্রশাসন চিকিৎসক

মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত চিকিৎসকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বসানো, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পরিপত্র ও আদেশের ফলে চিকিৎসকরা বিভিন্ন সময় প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন সরকার ও সাধারণ মানুষের কাছে, যা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস চিকিৎসা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সম্প্রতি জারি করা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন। এ নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীকে পাঠানো বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক চিঠিতে তার আভাস মেলে। চিঠিতে বলা হয়—‘যখনই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রবাহিত হয়, তখনই আপনার মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দপ্তরের কিছু আকস্মিক ও অবৈজ্ঞানিক আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশনা গোটা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল সুকৌশলে চিকিৎসকদের জনগণ ও সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।’

গত ৬ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ও মহাসচিবের পাঠানো চিঠিতে এই অভিযোগ করা হয়। এর আগেও বেশ কিছু ঘটনায় বিএমএ ছাড়াও একাধিক চিকিৎসক সংগঠনের নেতারা এ ধরনের অভিযোগ করেছেন। মাঠপর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসন থেকেও বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ ও বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ করা হয়েছে। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কোনো শাখায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বসানোর চেষ্টা চলছে, এমন অভিযোগও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দিন দিন জোরালো হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের দাবি।

এদিকে করোনাকালে চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টা এবং কোয়ারেন্টিনে থাকা নিয়ে জারি করা পরিপত্রটি প্রত্যাখ্যান করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিএমএ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন নিয়ে চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কাঠামোগত সংস্কার করা না হলে মুখোমুখি এই অবস্থান অব্যাহত থাকবে। এর জেরে প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়ে সেসব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসকদের ওপর। একই সঙ্গে নানাভাবে উসকানিমূলক তৎপরতাও চালানো হচ্ছে। অথচ চিকিৎসকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা করা হচ্ছে না। এ নিয়ে চিকিৎসকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ। তবে বর্তমানের করোনা মহামারি পরিস্থিতি এবং সরকারের ভাবমূর্তির কথা বিবেচনায় রেখে আমরা দাঁত চেপে সহ্য করে যাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি কোয়ারেন্টিন নিয়ে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে তা রীতিমতো কাণ্ডজ্ঞানহীন। এই প্রজ্ঞাপনের ফলে বর্তমানে কোনো চিকিৎসক হাসপাতালে দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফিরে গেলে তাঁর পরিবারের কেউ যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়, তাহলে কোনো চিকিৎসককেই আর হাসপাতালে দায়িত্বে ধরে রাখা যাবে না। তখন কিন্তু বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। এমন একটি পরিপত্র জারির আগে প্রয়োজন ছিল চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা। তাহলে সমস্যা এ পর্যায়ে আসত না।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘একজন অতিরিক্ত সচিবকে মিডিয়ায় বলতে শুনেছি, চিকিৎসকরা নাকি হোটেলের বিল তুলে নিয়ে বাসায় থেকেছে। এসব কোনো কথা না। এসব ডাহা মিথ্যা।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন চিকিৎসক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পরিবর্তনের সময় চেষ্টা করা হয়েছিল ওই পদে একজন অতিরিক্ত সচিব, আরেকটি পরিচালক পদে একজন যুগ্ম সচিবকে নিয়োগ দেওয়ার। চিকিৎসক নেতাদের শক্ত অবস্থানের কারণে প্রশাসন তা করতে পারেনি। এসব অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক পদে একজন অতিরিক্ত সচিবকে বসানো হয়েছে। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক যখন সভা ডাকেন সেখানে ওই পরিচালক উপস্থিত থাকেন না।’

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই ইস্যুতে বিএমএর অবস্থান সঠিক। এই ইস্যুতে আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। স্বাচিপের পক্ষ থেকে কাল (আজ রবিবার) একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। কারণ মন্ত্রণালয়ের এমন আচরণে চিকিৎসকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিএমএ সর্বজনীন সংগঠন। এ ধরনের ইস্যুতে আমরা বিএমএর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি নতুন কিছু নয়। মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের সিস্টেমেই এটি চলে আসছে। দেশে ২৯টি ক্যাডার সার্ভিস আছে। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার করতে চাইলে অন্য খাতেও করতে হবে। এসবের বাইরে আমাদের কাছে বড় বিষয়, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া। সব দাবি পূরণ করতে গেলে সেটাও সমস্যা।’

প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিএমএর প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক কিছু পর্যালোচনা করে তবেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবু কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে তা আলোচনা করা যেতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে রবিবার (আজ) বিএমএ নেতাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হবে।’

অন্যদিকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক এমপি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য প্রশাসনের ভেতরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। স্বাস্থ্য খাত ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে সবার আগে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে। মন্ত্রণালয়ে যাঁরা স্বাস্থ্য প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা সঠিকভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বোঝেন না। এর জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব চিকিৎসকদের করা; যা বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত রয়েছে। উপজেলা থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যে চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য প্রশাসনে থাকবেন, তাঁদের স্বাস্থ্য প্রশাসন পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে।’

বিএমএর চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কোনো তারকা চিহ্নিত হোটেল, কোনো ভাতা, বিশেষ খাবার চাননি চিকিৎসকরা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে যথাসম্ভব নিরাপদ উপায় অবলম্বন করে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করে যেতে চান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা