kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

১৭ ঘণ্টা স্টিয়ারিংয়ে চালক

বাস পিষে মারল ছয়জনকে

মুক্তাগাছায় সাতজনসহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জেলায় নিহত ২৪

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাস পিষে মারল ছয়জনকে

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পাখিভ্যান (স্থানীয়ভাবে তৈরি তিন চাকার ইঞ্জিনচালিত গাড়ি), একটি আলমসাধু ও একটি মোটরসাইকেল। হঠাৎই পেছন থেকে দ্রুতগতিতে একটি বাস এসে ধাক্কা দেয় গাড়ি তিনটিকে। এতে প্রাণ যায় ছয়জনের, আহত হন তিনজন। এর কিছুক্ষণ আগে বাসটি রাস্তার পাশে এক বিক্রেতার মুরগির খাঁচায় ধাক্কা দিয়ে আসে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ বাজারে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়কে ঘটে এসব দুর্ঘটনা। পুলিশ ও এক নিহত ব্যক্তির স্বজন বলছে, চালক টানা ১৭ ঘণ্টা বাসটি চালিয়েছেন। এতে তিনি ক্লান্ত ছিলেন। ফলে বাসে ঘুমে ঢুলেছেন। এ কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

একই দিন বিকেলে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মানকোন এলাকায় ময়মনসিংহ-জামালপুর মহাসড়কে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। নিহত সবাই অটোরিকশাটির যাত্রী। তাদের মধ্যে তিনজন একই পরিবারের সদস্য।

আরো ৯ জেলায় গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাবেক শিক্ষক, ব্র্যাক কর্মকর্তা, শিক্ষার্থীসহ ১১ জন।

চুয়াডাঙ্গায় হতাহত সবাই সদর উপজেলার বাসিন্দা ও একজন বাদে অন্যরা কৃষি শ্রমিক। নিহত চারজনের বাড়ি তিতুদহ গ্রামে। তাঁরা হলেন খাড়াগোদা গ্রামের মাহতাব আলীর ছেলে মোটরসাইকেল আরোহী মিলন হোসেন (৪০), তিতুদহ গ্রামের নোতা আলীর ছেলে মোহাম্মদ সোহাগ (২০), একই গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে শরীফ হোসেন (৩০), আলী হোসেনের ছেলে রাজু হোসেন (৩০) ও হায়দার আলীর ছেলে কালু হোসেন (৪০) এবং বসুভাণ্ডারদহ গ্রামের শ্রী হাওলাদারের ছেলে ষষ্ঠী কুমার (৩৫)। আহতরা হলেন তিতুদহ গ্রামের বাবলু হোসেন (৪৫) ও আলমগীর হোসেন (২৮) এবং মোহাম্মদজুমা গ্রামের আকাশ আলী (১৮)। এঁরা চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পল্লী চিকিৎসক মিলন হোসেনের জমিতে কাজ করতে যাচ্ছিলেন কৃষি শ্রমিকরা। মিলন ছিলেন মোটরসাইকেলে। শ্রমিকরা ছিলেন পাখিভ্যানে।

রয়েল পরিবহনের ঘাতক বাসটির চালক আসাদুল হককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি আবু জিহাদ মোহাম্মদ ফখরুল আলম খান জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় রয়েল পরিবহনের গাড়ি নিয়ে ওই চালক চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান। ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৮টা বেজে যায়। পরে রাত সাড়ে ১০টায় আবার ওই চালক চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে গাড়ি নিয়ে যাত্রা করেন। ওসি বলেন, প্রায় সাড়ে ১৮ ঘণ্টা চালককে গাড়ি চালাতে হয়েছে। মাঝখানে বিরতি মাত্র দেড় ঘণ্টা। এই হিসাবে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগই পাননি চালক। চালক স্বীকার না করলেও তিনি একটানা ১৭ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত ছিলেন। এ কারণেই ঘটেছে দুর্ঘটনা। চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকার দূরত্ব ২১৪ কিলোমিটার। এত বেশি পথ টানা যাওয়া-আসা করা ঠিক নয়। তিতুদহ গ্রামের নিহত এক শ্রমিকের স্বজন বলেন, ‘আমরা জেনেছি, দীর্ঘসময় একটানা গাড়ি চালিয়ে ওই চালক গাড়িতে মাঝেমধ্যে ঘুমে ঢুলছিলেন। খুবই ক্লান্ত ছিলেন।’

চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল সালাম জানান, ঘটনাস্থলে পাখিভ্যানটিতে ছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। বাসটির ধাক্কায় পাখিভ্যানের দুই শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। এরপরই বাসটি আলমসাধু ও মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। মোটরসাইকেলের চালকও মারা যান। আহতদের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অ্যাম্বুল্যান্সে করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ১০টার দিকে মৃত্যু হয় আরেকজনের। দুর্ঘটনার পরই বাসটি দ্রুতগতিতে চুয়াডাঙ্গার অদূরে বিজিবি ক্যাম্প এলাকার কাছাকাছি যায়। সেখানে বাস রেখে পালিয়ে যান চালক। খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার পুলিশ গাড়িটি হেফাজতে নেয়। সদর থানার ওসি জানান, দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় চালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

মুক্তাগাছায় নিহতরা হলেন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার সোলাকুড়ি ইউনিয়নের নয়াকুড়ি গ্রামের নূর ইসলাম (৩০), তাঁর স্ত্রী মোছা. তাসলিমা (২৬) ও মেয়ে লিজা (১০) এবং অটোরিকশাচালক মো. আলাদুল (৩৮), যাত্রী মো. নজরুল (৩৫), ইসলাম (৫৫) ও সাইদুল ইসলাম (৪৫)। তাঁদের কয়েকজন মুক্তাগাছার ইসাখালী গ্রামের বাসিন্দা। মুক্তাগাছা থানা সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে আসা জামালপুরগামী রাজীব পরিবহন বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৮-৮৩০৪) ময়মনসিংহ শহর ও মুক্তাগাছা সদর হয়ে জামালপুরের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু মানকোনা এলাকায় যাত্রীবাহী অটোরিকশা ও বাসটির মুখোমুখী সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে রাস্তার পাশে গিয়ে উল্টে পড়ে। পরে পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে। বাসটির চালক কামাল হোসেনকে (৫৩) আটক করেছে পুলিশ।

আরো ৯ স্থানে ১১ জনের মৃত্যু

ঢাকার ধামরাইয়ের কচমচ এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গতকাল অজ্ঞাতপরিচয় বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ব্র্যাক কর্মকর্তা আলাউদ্দিন শেখ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তাঁর বন্ধু একই গ্রামের মাহবুবুর রহমান। আলাউদ্দিনের বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালীর গরিয়ানা গ্রামে। ঈদের ছুটিতে এসে গত সোমবার বিয়ে করেন তিনি। ছুটি শেষে কর্মস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ব্র্যাক কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার রনশিয়া গ্রামে পীরগঞ্জ-চন্দরিয়া সড়কে শুক্রবার সন্ধ্যায় পাওয়ার টিলার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিক্ষার্থী আজহারুল ইসলাম (১৭) নিহত হয়। আহত হয় দুজন। আজহার বৃদ্ধিগাঁওয়ের শাহাদাত হোসেনের ছেলে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলা পরিষদের সামনে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে শুক্রবার রাতে বাসচাপায় নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী দিলীপ কুমার রায় (৩৪)। তিনি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গাড়িবাকসী গ্রামের মৃত তারাপদ রায়ের ছেলে। খুলনার আঙ্গারদহা দাখিল মাদরাসার সামনে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে গতকাল দুপুরে ট্রাক-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী ইমান আলী মোল্লা (৬৫) নিহত হন। তিনি ডুমুরিয়া উপজেলার চহেড়া গ্রামের বাসিন্দা, মিকশিমিল-রুদাঘরা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও পল্লী চিকিৎসক।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সাওঘাট এলাকার রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার সড়কে শুক্রবার রাতে ড্রাম ট্রাক ও যাত্রীবাহী সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন দুজন। তাঁরা হলেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার চরশিথলপুরের সেলিম মাতবরের ছেলে নাসির মাতবর (২৮) ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচগাঁও চরপাড়ার সাহিদ মিয়ার ছেলে ওয়াজিব (১৪)। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার বাস্তা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হেমায়েতপুর-মানিকগঞ্জ সড়কে শুক্রবার রাতে পিকআপভ্যান ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ দুজন নিহত হয়। তাঁরা হলেন মাগুরার শ্রীপুরের বরতলা গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে আব্দুল্লাহ (৮) ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আইরমাড়া গ্রামের আছালত খানের ছেলে আশরাফ খান (৫০)।

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের কুচিয়ামোড়া কলেজগেট এলাকায় ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে গতকাল দুপুরে ট্রাকচাপায় পথচারী সুমন মিয়া (২৭) নিহত হন। তিনি ঢাকার লালবাগ থানার ইসলামবাগের মো. আলী মিয়ার ছেলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার রুটি গ্রামে শুক্রবার সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের মো. সাজু মিয়া (৬০) নিহত হন। তিনি সপরিবারে রুটি গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।

দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত?

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের মৃত রহিম উদ্দিনের স্ত্রী ফিরোজা বেগম (৫০) প্রতিদিনের মতোই শুক্রবার বিকেলে গ্রামে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। ফিরোজার পরিবারের দাবি, এ সময় একই গ্রামের মোমিন উদ্দিন (২৫) পূর্বশত্রুতার জের ধরে দ্রুতগতির মোটরসাইকেল দিয়ে পেছন থেকে ফিরোজাকে ধাক্কা মেরে আহত করেন। পরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফিরোজার মৃত্যু হয়। তবে মোমিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে জেলার রাজপাড়া থানায় ইউডি মামলা হয়েছে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা