kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

ভয় কেটেছে ঝুঁকি কাটেনি

তৌফিক মারুফ   

৮ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভয় কেটেছে ঝুঁকি কাটেনি

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্ক ও ভয় কেটে গেছে; কিন্তু ঝুঁকি কাটেনি। সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে না ঠিকই, তবে দ্রুতগতিতে কমছেও না। পরীক্ষার ভোগান্তি আগের মতো না থাকলেও মানুষের আগ্রহ কমেছে। বহুল প্রত্যাশিত অ্যান্টিবডি টেস্ট চালু না হলেও দৃশ্যত নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে তেমনভাবে সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কিন্তু আজ শনিবার ৮ আগস্ট দেশে যখন করোনা সংক্রমণ পঞ্চম মাস পার করেছে তখন প্রকৃত পরিস্থিতি কী, সেটা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে ধন্দে আছেন বিশেষজ্ঞরাও। এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক হিসাবে সর্বোচ্চ সংক্রমণের দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় স্থানে থাকা প্রতিবেশী ভারত নাকি চীন—ইউরোপের মতো পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি, তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।

বাংলাদেশে গত পাঁচ মাসের সংক্রমণ, মৃত্যু ও সুস্থ হওয়ার যে সূচক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য থেকে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে কালের কণ্ঠ দেখেছে, সংক্রমণ যেন একটি বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

দেশে এখন পর্যন্ত সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা বা সমীক্ষা করতে পারেনি কোনো প্রতিষ্ঠানই। নিজেদের সাধারণ পর্যবেক্ষণ অনুসারে কেউ বলছেন, কোনো কোনো এলাকায় হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। আবার কেউ বলছেন, সামনে আসছে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের এখানে সংক্রমণ বাড়ছেও ধীরগতিতে, কমবেও ধীরগতিতে। ভারত বা আমেরিকার মতো দ্রুত কোনো ঊর্ধ্বগতির সম্ভাবনা খুব একটা নেই। তাই বলে যে মোটেই বাড়বে না, সেটাও কিন্তু বলা যাবে না। বরং সামনে দু-এক সপ্তাহ বাড়ার ঝুঁকির মধ্যে কিন্তু আমরা আছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যাঁরা হার্ড ইমিউনিটির কথা বলেন তাঁরা আসলে ঠিক বলছেন না। কারণ হার্ড ইমিউনিটির জন্য যে হারে সংক্রমণ ও মৃত্যু দরকার, সেটা এখানে হয়নি বা কখনো হবে বলেও মনে হচ্ছে না। ফলে এর কোনো ভিত্তি নেই।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অণুজীববিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল মনে করছেন যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো এলাকায় ব্যাপক হারে সংক্রমণ ঘটে গেছে, যেখানে আপনাআপনি হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘অন্য বিভাগ বা অঞ্চলে এখনো সংক্রমণ হচ্ছে, তবে সেটা খুব বেশি সময় স্থায়ী হবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখানে অ্যান্টিবডি টেস্টটা খুবই জরুরি ছিল। অ্যান্টিবডি টেস্ট করা গেলে অনেকের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ে যে সংশয় দেখা দিয়েছে তা সহজেই কেটে যেত।’

ড. আলমগীর অবশ্য জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকেই আইইডিসিআরের উদ্যোগে দেশে কমিউনিটি পর্যায়ে অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু করবেন। একই সঙ্গে কার্যকর অ্যান্টিজেন টেস্টের উপকরণ পেলে সেটাও শুরু করা হবে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে যে পরিস্থিতি হয়েছে আমাদের এখানে তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ওই দেশ দুটিই অনেক বড়। এক এলাকায় সংক্রমণ হয়ে শেষ হওয়ার পর আরেক এলাকায় নতুন করে শুরু হয়। এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যের দূরত্ব অনেক। আমাদের দেশে তেমন পরিস্থিতি নেই।’

গত ২০ জুন যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণের পাঁচ মাস পূর্ণ হওয়ার দিন পর্যন্ত আক্রান্ত ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ২৪০ জন। মারা গেছে এক লাখ ১৯ হাজার ৬৪৫ জন। গত ৩০ জুন ভারতে সংক্রমণের পাঁচ মাস পূর্ণ হওয়ার দিন পর্যন্ত শনাক্ত ছিল পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার ৮৪০ জন। মারা গেছে ১৬ হাজার ৮৯৩ জন। এই মুহূর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণের দেশ ব্রাজিলে পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে গত ৫ জুলাই। সেদিন পর্যন্ত ওই দেশে শনাক্ত ছাড়িয়ে যায় ১৬ লাখ এবং মারা যায় ৬৫ হাজার। বড় ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে—পাঁচ মাস পর দুটি দেশেই সংক্রমণ দ্রুতই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা এখনো ঊর্ধ্বমুখীই আছে।

অন্যদিকে গত ৮ মার্চ দেশে করোনা শনাক্তের ঘোষণা আসে। গতকাল শুক্রবার সংক্রমণের পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে, মোট শনাক্ত হয়েছে দুই লাখ ৫২ হাজার ৫০২ জন। মারা গেছে তিন হাজার ৩৩৩ জন। এ মুহূর্তে সংক্রমণের বৈশ্বিক হিসাবে বাংলাদেশ ১৫তম স্থানে রয়েছে। আর মৃত্যুর দিক থেকে রয়েছে ৭২তম স্থানে।

দেশে পঞ্চম মাসে শনাক্ত ও মৃত্যু দুটিই আগের মাসের তুলনায় কিছুটা হলেও কমেছে। চীন ও ইউরোপের দেশগুলোতে দু-তিন মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত বেড়ে যায়। এরপর আবার কমেও যায় দ্রুত। ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোতে সংক্রমণ কমে পঞ্চম মাসে এসে একেবারেই নিচে নেমে যায়। বাংলাদেশের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, যেহেতু দেশে ইতালির ভাইরাসের এক ধরনের রূপ পাওয়া গেছে একাধিক জিনোম সিকোয়েন্স থেকে, তাই এখানে ইতালি বা ইউরোপের সংক্রমণে পরিস্থিতির প্রভাব বেশি রয়েছে। যদিও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে তীব্রগতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুততার সঙ্গে অল্প সময়ে অনেক মানুষকে মেরে দুর্বল হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো পাঁচ মাস সময় লাগেনি। তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা আবার জোর দিয়ে বলছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো বাংলাদেশেও পাঁচ মাস পার হওয়ার পর বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের মতে, কোরবানির ঈদ ঘিরে যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হয়েছে, এর পরিণতি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো হতে পারে।

বাংলাদেশে গত পাঁচ মাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রথম চার মাস শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েছে বেশ বড় সময়ের ব্যবধানে। কিন্তু পঞ্চম মাসে এসে শনাক্ত ও মৃত্যু দুটিই যেমন কমেছে তেমনি সুস্থ হয়েছে অনেক বেশি। গত ৮ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম এক মাসে শনাক্ত ছিল ২১৮ জন এবং মারা যায় ২০ জন। দ্বিতীয় মাসে শনাক্ত হয় ১২ হাজার ৯১৬ জন এবং মারা যায় ১৮৬ জন। তৃতীয় মাসে শনাক্ত হয় ৫৫ হাজার ৩৭৪ জন এবং মারা যায় ৭২৪ জন। চতুর্থ মাসে শনাক্ত হয় এক লাখ ১৩৭ জন এবং মারা যায় এক হাজার ২২১ জন। পঞ্চম মাসে শনাক্ত হয় ৮৩ হাজার ৯৫৭ জন এবং মারা যায় এক হাজার ১৮২ জন। অন্যদিকে প্রথম মাসে সুস্থ হয়েছে ১৬৫ জন, দ্বিতীয় মাসে এক হাজার ৯৬৬ জন, তৃতীয় মাসে ১২ হাজার ৪৫৯ জন, চতুর্থ মাসে ৬৩ হাজার ৫৪২ জন এবং পঞ্চম মাসে ৬৭ হাজার ৪৮২ জন সুস্থ হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আগের তুলনায় সংক্রমণ কমে গেলেও মোট সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো বেশি। গত মাস থেকেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের তুলনায় অন্য বিভাগগুলোতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক আহমেদ বলছেন, ‘সমালোচনা থাকলেও শুরু থেকেই আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম যে সংক্রমণের গতি কমিয়ে রাখা, যাতে হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় না যায়। সে ক্ষেত্রে আমি বলব, আমরা সফল হয়েছি। তা না হলে আক্রান্ত ও মৃত্যু অনেক বেশি হতো। তবে এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সংক্রমণের গতি যাতে কোনোভাবেই ঊর্ধ্বমুখী না হয় সে জন্য কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। চীন ও ইউরোপের যেসব দেশে দু-তিন মাসের মধ্যে সংক্রমণের বিস্ফোরণ ঘটে আবার মিলিয়ে গেছে সেটা আপনাআপনি হয়নি। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেটাকে টেনে নামানো হয়েছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা