kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

হাওরে বেড়াতে গিয়ে লাশ হলেন ১৭ জন

► সাতজন একই পরিবারের
► নেত্রকোনার গ্রামে কান্নার রোল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা প্রতিনিধি   

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাওরে বেড়াতে গিয়ে লাশ হলেন ১৭ জন

আর্তনাদ : নেত্রকোনার মদনে নৌকাডুবিতে গতকাল দুপুরে স্বজন হারিয়েছেন তাঁরা। কোনো সান্ত্বনাই তাঁদের আর্তনাদ থামাতে পারছে না। ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নেত্রকোনার মদন উপজেলার রাজালিকান্দা হাওরে ট্রলার ডুবে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে একজন। গতকাল বুধবার দুপুর ১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

যাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তাঁরা ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের একটি মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তাঁরা হাওরে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

মৃত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই চরসিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের। এর মধ্যে এক বাড়িরই ১০ জন, আর একটি পরিবারের সাতজন। এ ঘটনায় পুরো গ্রামেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। 

যাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে আছেন মাক্কাদুল ছুন্নাহ মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহফুজুর রহমান, তাঁর ছেলে মাহবুব ওরফে আসিফ ও মাহমুদ, ভাগ্নি জুলফা ও লুবনা, ভাতিজা জুবায়ের, মোজাহিদ ও সাইফুল ইসলাম রতন; জাহিদ, শামীম হাসান, শফিকুল, শহিদুল, ইসা মিয়া, আজহারুল, সামাআন, রেজাউল করিম ও হামিদুল। তাঁদের  লাশ পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরসিরতা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের মাক্কাদুল ছুন্নাহ মাদরাসার ৩৮ জন ছাত্র-শিক্ষক এবং নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতি মাদরাসার ১০ জন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মদনের উচিতপুরে হাওরে বেড়াতে আসেন। তাঁরা উচিতপুর থেকে একটি ট্রলারে করে গোবিন্দশ্রীর দিকে যাচ্ছিলেন। দুপুর ১টার দিকে রাজালিকান্দা হাওরে প্রচণ্ড ঢেউয়ে তাঁদের ট্রলারটি ডুবে যায়। তাত্ক্ষণিক আশপাশে থাকা নৌকা তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। ট্রলারের ৩০ যাত্রী সাঁতরে আশপাশের নৌকায় উঠতে সক্ষম হন।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে এসে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় উদ্ধার তৎপরতা চালায়। একে একে ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করে তারা।

মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ তালুকদার সাংবাদিকদের জানান, রাজালিকান্দা হাওরে ট্রলারডুবির ঘটনায় বিকেল ৪টা পর্যন্ত দুই শিশুকন্যাসহ ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছে। জীবিত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ছয়জনকে মদন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

নেত্রকোনা জেলার পুলিশ সুপার আকবর আলী মুন্সী জানান, উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে ময়মনসিংহের একই পরিবারের আছেন সাতজন।

জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম জানান, মরদেহ বাড়িতে নেওয়া ও দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেকের পরিবারকে তাত্ক্ষণিক পাঁচ-সাত হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

কোনাপাড়া গ্রামে কান্নার রোল

বিকেল ৫টার দিকে সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের কাছাকাছি হতেই চরে ছড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। গ্রামে পৌঁছে একটি বাড়ির উঠানে দেখা গেল, আর্তনাদ আর আহাজারি করছে বেশ কয়েকজন। তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিল পড়শিরা।

চর সিরতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ সাংবাদিকদের বলেন, খবর পাওয়ার পর তিনি এলাকার লোকজন নিয়ে মদনে ছুটে যান। তিনি বলছিলেন, স্থানীয় মাক্কাদুল সুন্নাহ মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহফুজুর রহমান এলাকার ছাত্র-যুবকদের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ৪৮ জনের দল ছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এ সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে।

ইউপি চেয়ারম্যান জানান, কোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান মারা গেছেন। তাঁর দুই ছেলে, দুই ভাগ্নি, দুই ভাতিজা ও এক ভাগ্নেসহ আরো কয়েকজন নিকটাত্মীয় ওই দলে ছিল। এই পরিবারের বেশ কয়েকজন মারা গেছে।

মাহফুজুর রহমানের বাড়ির লোকজন বলছিল, ওই বাড়িরই ১০ জন মারা গেছে। যারা মারা গেছে তাদের বেশির ভাগই ওই গ্রামের। সবাই কারো না কারো আত্মীয় বা স্বজন। তাই শোক, কান্না আর আহাজারি গ্রামজুড়েই। গ্রামের বেশির ভাগ পুরুষই ছুুটে গেছেন দুর্ঘটনাস্থলে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, প্রায় প্রতিবছরই এলাকার লোকজন দল বেঁধে বেড়াতে যায়। অনেক সময় বেড়ানোর এই দলের নেতৃত্বে থাকেন অধ্যক্ষ মাহফুজুর রহমান। এবারও তাঁর নেতৃত্বেই মদনের হাওরে বেড়াতে গিয়েছিল ওই দলটি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা