kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

বাংলাদেশি চারজন নিহত আহত ৯৯

► নৌবাহিনীর জাহাজ বিজয় ক্ষতিগ্রস্ত
► ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাতম

বিশেষ প্রতিনিধি   

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশি চারজন নিহত আহত ৯৯

লেবাননের বৈরুতে গত মঙ্গলবার অফিসের কাজ শেষ করে বাসার চারতলার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই প্রবল কাঁপুনি অনুভব করেন বাংলাদেশ দূতাবাসের দূতালয়প্রধান আবদুল্লাহ আল মামুন। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এসে দেখেন, আরো অনেকে সেখানে জড়ো হয়েছে। আকাশে তখন লাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সন্ত্রাসী হামলা প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা। আবদুল্লাহ আল মামুন ভেবেছিলেন, এবারের ঘটনাটিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে খবর আসতে থাকে, বৈরুত বন্দরে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে।

বৈরুতে গত মঙ্গলবার বিস্ফোরণের সময় ওই শহরে বাসার পাশে বসে ছিলেন বাবু সাহা। গতকাল বুধবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প। উঠে দাঁড়ানোর পরও দুলুনি টের পাই। এর মধ্যেই ভবনের কাচ ভেঙে পড়তে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশজুড়ে বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হয়।’

দূতালয়প্রধান আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই বিস্ফোরণে অন্তত চারজন বাংলাদেশির প্রাণ হারানোর তথ্য পেয়েছি। এ ছাড়া আহত হয়েছে প্রায় ৯৯ জন। এদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি নৌসেনা এবং ৭৮ জন বেসামরিক নাগরিক।’

তিনি আরো বলেন, নিহত চার বাংলাদেশির মধ্যে রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের ভাদেশ্বরা গ্রামের মেহেদী হাসান রনি, রাসেল মিয়া, কুমিল্লার রেজাউল এবং মাদারীপুরের মিজান। নিহতরা লেবাননে বৈধভাবে বাস করতেন।

তিনি বলেন, “বৈরুত বন্দরে বিস্ফোরণের খবর জানার পরপরই আমরা জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’-এর খোঁজ নিই। নৌবাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁদের জাহাজটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নৌবাহিনীর আহত সদস্যদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”

এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বৈরুত বন্দরের একটি ওয়্যারহাউসে ভয়াবহ বিস্ফোরণে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে মেরিটাইম টাস্কফোর্সের অধীনে নিয়োজিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’-এর ২১ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হারুন উর রশীদ। তাঁকে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত মেডিক্যাল সেন্টারে (এইউবিএমসি) ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের লেবাননে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী বাহিনী ইউনিফিলের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হেলিকপ্টার/অ্যাম্বুল্যান্সযোগে হামুদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা আশঙ্কামুক্ত। শান্তি রক্ষা মিশন ইউনিফিলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আহত নৌ সদস্যদের চিকিৎসা চলমান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাতম

কালের কণ্ঠ’র ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, বৈরুতে বিস্ফোরণের ঘটনার সময় গত মঙ্গলবার বিকেলে বাবা ও মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন মেহেদি হাসান রনি। ঠিক ওই সময় বাবা তাজুল ইসলাম বিকট শব্দ শুনতে পান। এর পরই ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রথমে তাঁরা জানতে পারেন, রনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। পরে আসে তাঁর মৃত্যুর খবর।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছিহাতা ইউনিয়নের ভাদেশ্বরা গ্রামের তাজুল ইসলামের ছেলে রনির মৃত্যুতে পুরো পরিবারে চলছে মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন অসহায়। রনি সেখানে একটি শপিং মলে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

রনির ছোট বোন জেসমিন আক্তার হ্যাপি জানান, লেবাননে বিস্ফোরণের পর শুনেছেন তাঁর ভাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নামাজ পড়ে মোনাজাত করে ভাইয়ের প্রাণভিক্ষা চান; কিন্তু গতকাল ভোরে শোনেন, রনি বেঁচে নেই।

রনির পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন রনি। গ্রামের একটি স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। বাহরাইনপ্রবাসী বাবা তাজুল ইসলাম প্রবাসে সুবিধা করতে না পারায় পরিবারের কথা ভেবে রনি বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ লেবাননে পাড়ি জমান রনি। এর মধ্যে রনির বাবা তাজুল ইসলাম বাহরাইন থেকে দেশে ফেরত আসেন। পরিবারের জন্য হাসিমুখেই কাজ করে যাচ্ছিলেন রনি।

মিজানুরের পরিবার শোকে পাথর

কালের কণ্ঠ’র মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, মাদারীপুরের কালকিনির শিকারমঙ্গল ইউনিয়নের কাজীকান্দি গ্রামের জাহাঙ্গীর খানের ছেলে মিজানুর রহমান খান (২৫)। বৈরুতে বিস্ফোরণে মিজান নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের সবাই এখন শোকে পাথর। পরিবারের ভরণপোষণের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি দিশাহারা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে লেবাননের বৈরুতে যান মিজানুর। সেখানে একটি হোটেলে কাজ করতেন তিনি। মঙ্গলবার বিস্ফোরণে মারা যান তিনি। মিজানুরের মৃত্যুর খবর জানার পর পরিবারের সবাই ভীষণ ভেঙে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের একটু সুখের আশায় লেবাননে পাঠানো হয় মিজানুরকে। ভাই-বোনের মধ্যে মিজানুর সবার বড়। মিজানুরের স্ত্রী ও তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

বিলাপ করতে করতে মিজানুরের বাবা জাহাঙ্গীর খান বলেন,  ‘মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে আমার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশে আসবে বলে জানিয়েছে। বুধবার ভোরে জানতে পারি, আমার মিজানুর বিস্ফোরণে মারা গেছে। আমি আমার সন্তানের লাশ ফেরত চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা