kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

পবিত্র হজ পালিত

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত

হজের খুতবায় করোনা থেকে মুক্তি কামনা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার পবিত্র হজ পালিত হলো অনেকটা অচেনা রূপে, সীমিত পরিসরে, কঠোর নিরাপত্তায়। পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনা নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার হজ পালন করেছেন অল্পসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমান। হজের খুতবায় বৈশ্বিক মহামারি থেকে মুক্তি ও আল্লাহর রহমত কামনা করা হয়েছে। সৌদি আরবে আজ শুক্রবার উদ্যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।

গতকাল সূর্যোদয়ের পর হজযাত্রীরা মিনা থেকে রওনা হন ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানের দিকে। তাঁদের কণ্ঠে ছিল একটাই রব, ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক।’ অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।

অন্যান্য বছরে যেখানে ২০ থেকে ২৫ লাখের বেশি মুসল্লির পদচারণে মুখর হয় আরাফাতের ময়দান, এবার করোনার কারণে বিধি-নিষেধে সেখানে শুধু সৌদিতে অবস্থানরত ১০ হাজার মুসল্লি সুযোগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে কোনো কোনো সূত্র এবার হজযাত্রীর সংখ্যা এক হাজার বলেও উল্লেখ করেছে। সৌদি আরবের বাইরের কাউকে এবার হজের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

হজের তিন ফরজের মধ্যে ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাপমুক্তির আকুল বাসনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। এ সময় সবাই মুখে মাস্ক পরেছেন ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলেছেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে জিকিরসহ অন্যান্য ইবাদত করেন। কেউ কেউ যান জাবালে রহমত নামে পাহাড়ের কাছে। পরে হাজিরা যান মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা শুনতে। এই আরাফাতের ময়দানেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন।

দুপুরে মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা ও বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন খতিব শায়খ আবদুল্লাহ বিন সোলায়মান আল মানিয়া। আরবি খুতবা তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাসহ ১০টি ভাষায় সম্প্রচার করা হয়। খুতবায় তিনি বৈশ্বিক মহামারি থেকে মুক্তি, গুনাহ মাফ, আল্লাহর রহমত কামনাসহ সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে বিশ্ববাসীর প্রতি নানা নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। খতিব আশাবাদ ব্যক্ত করেন, খুব দ্রুত করোনা মহামারি কেটে যাবে; আবার আগের মতো হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের আগমনে মুখরিত হবে পবিত্র এই ভূমি। ৩০ মিনিটব্যাপী খুতবা শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন তিনি।  

খুতবা ও দোয়া শেষে হাজিরা সেখানে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন। হাজিরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থানের পর মুজদালিফায় গিয়ে একসঙ্গে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। মুজদালিফায় খোলা প্রান্তরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়। শয়তানের উদ্দেশে পর পর তিন দিন ছোড়ার জন্য ৭০টি পাথর এখান থেকেই সংগ্রহ করা হয়। এবার হাজিদের জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা পাথর সরবরাহ করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিরা আজ ফিরবেন মিনায়। মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ছেঁটে (ন্যাড়া করে) গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দুই টুকরা কাপড় বদল করবেন। এরপর স্বাভাবিক পোশাক পরে মিনা থেকে মক্কায় গিয়ে পবিত্র কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করবেন।

কাবার সামনের দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় সাঈ (সাতবার দৌড়াবেন) করবেন। সেখান থেকে তাঁরা আবার মিনায় যাবেন। মিনায় যত দিন থাকবেন তত দিন তিনটি (বড়, মধ্যম, ছোট) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। আবার মক্কায় বিদায়ি তাওয়াফ করার পর হাজিরা নিজ নিজ গৃহে ফিরবেন। জামারায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের পর হাজিদের পশু কোরবানি দিতে হয়। বেশির ভাগ হাজি নিজে বা বিশ্বস্ত লোক দিয়ে মুস্তাহালাকায় (পশুর হাট ও জবাই করার স্থান) গিয়ে কোরবানি দেন।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধানে হজের সব কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন হাজিরা। তাঁদের এবার মিনায় তাঁবুর পরিবর্তে নির্ধারিত হোটেলে রাখা হয়। যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং এহরামের কাপড়সহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হয় সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে।

করোনার কারণে যাঁরা আগে হজ করেননি, এমন ব্যক্তিদেরই এবার হজের সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৭০ শতাংশ সৌদি আরব প্রবাসী এবং বাকি ৩০ শতাংশ মুসল্লি সৌদির নিরাপত্তাকর্মী ও চিকিৎসক। হজে অংশ নেওয়া সবার বয়সই ২০ থেকে ৫০-এর মধ্যে। এবার কোনো হাজিকে কাবা শরিফ স্পর্শ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাঁচ ফুট দূরে থেকে তাওয়াফ, নামাজে অংশগ্রহণ, সাঈসহ হজের সব কার্যক্রম পালন করা হচ্ছে।

এদিকে সৌদি সরকারের নিয়মানুযায়ী হাজিদের আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন কাবা শরিফের গায়ে নতুন গিলাফ পরানো হয়। এ গিলাফ বা কিসওয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হয় কালো রঙের ৬৭০ কেজি খাঁটি রেশম। গতকাল কাবা শরিফে নতুন গিলাফ পরানো হয়েছে।

মন্তব্য