kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৭। ৬ আগস্ট  ২০২০। ১৫ জিলহজ ১৪৪১

সংক্রমণের ঢেউ এখন গ্রামমুখী

তৌফিক মারুফ   

৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সংক্রমণের ঢেউ এখন গ্রামমুখী

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঢেউ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে দুর্বল হয়েছে। কিন্তু এখন এই ঢেউ শক্তিশালী হয়ে আছড়ে পড়ছে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। এটা দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের কাছে। তাঁদের আশঙ্কা যে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক লোকজন চলাচলের কারণে ঢাকার বাইরে সংক্রমণ ঈদের পর আরো শক্তিশালী হতে পারে। সেই কারণে আগের তুলনায় মৃত্যুও বেশি ঘটতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখনই ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে সম্মিলিতভাবে মৃত্যুহার বেশি। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৫২ শতাংশ ঢাকার বাইরে এবং ৪৮ শতাংশ ঢাকা বিভাগে। মে মাস পর্যন্ত ৬০ শতাংশের বেশি মৃত্যুর হার ছিল ঢাকা বিভাগে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশে পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বেশি। ফলে গ্রামাঞ্চলে বয়স্ক মানুষ সংক্রমিত হলে তাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকবে বেশি।

সামনে ঢাকার বাইরে মৃত্যুর ঝুঁকি আরো বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে যুক্তি দিয়েছেন জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে আগের তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে বন্যা পরিস্থিতিও ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোকে বিপর্যস্ত করে তুলছে বেশি।

ডা. নজরুল বলেন, এখন তরুণরা আক্রান্ত বেশি হলেও তাদের মধ্যে মৃত্যুহার কম। বয়স্কদের মৃত্যু হচ্ছে বেশি। গ্রামাঞ্চলে আক্রান্তদের মধ্যে বয়স্কদের সমস্যা প্রকট হয়ে উঠলে তাদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তা ছাড়া তাদের জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা দেওয়াও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে আক্রান্ত হিসেবে যারা বাড়িতে মারা যাচ্ছে, তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে ঢাকার বাইরে বেশি। সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ বেড়ে গেলে এ ধরনের মৃত্যু আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে তিনি স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য বিভাগকে এখন সেদিকেই আরো জোরালোভাবে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্যসচিব ও আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে সংক্রমণ কমে গেছে। বরং এখন দ্বিতীয় ঢেউ হিসেবে সংক্রমণ শক্তিশালী হতে দেখা যাচ্ছে উত্তর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরে জেলা হিসেবে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বগুড়ায়। এ ছাড়া তাঁরা অনেকভাবে চেষ্টা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চলাফেরা ঠেকানো যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সংক্রমণ আরো বেড়ে গেলে ওই সব অঞ্চলের বয়স্ক ও আগে থেকেই জটিল রোগে ভুগতে থাকা মানুষের মধ্যে মৃত্যুহার বেড়ে যাবে। এ আশঙ্কার পক্ষে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালকও ডা. নজরুলের মতো একই কারণ উল্লেখ করেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১১টি দেশ নিয়ে গঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে বর্তমানে সংক্রমণের সূচকে দ্বিতীয় ও মৃত্যুর সূচকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সংক্রমণ ও মৃত্যু—দুই সূচক মিলে সবার ওপর রয়েছে ভারত। মৃত্যুর সূচকে ইন্দোনেশিয়া রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য-উপাত্ত অনুসারে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আট বিভাগের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে গত ৩ জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে সংক্রমণ নিচের দিকে নামছে। ঢাকায় এপ্রিল থেকে দ্রুতগতিতে বাড়ার পর সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল ১ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত। চট্টগ্রামে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সংক্রমণের গতি বেড়ে যায়। সেখানে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত। জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে ওপরে উঠতে শুরু করে রাজশাহী বিভাগের সংক্রমণ, যা এখনো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। একইভাবে জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে রংপুরে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে, এখনো সেটা কমছে না। জুনের তৃতীয় সপ্তাহে সংক্রমণ বেড়ে যায় খুলনায়। সেখানে এখনো চলছে ঊর্ধ্বমুখী ধারা। সিলেটের সংক্রমণ জুনের মাঝামাঝি থেকে বেড়ে যায়, যা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু এরপর কিছুটা নিচে নামে। এখন ধীরে ধীরে কখনো ওপরে উঠছে, কখনো নিচে নামছে। ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭ জুন থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত সংক্রমণ ছিল বেশি। এরপর নামতে শুরু করে। বরিশাল বিভাগে জুনের প্রথম থেকে সংক্রমণ বেড়ে যায়। একটানা ২৩ জুলাই পর্যন্ত ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে। গত সপ্তাহে কিছুটা নিচের দিকে থাকলেও এখন ওঠানামা করছে।

অধ্যাপক ড. সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘অঞ্চল ভেদেও সংক্রমণের ধরনে কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আমরা ছোট আকারে কিছু পর্যবেক্ষণে দেখেছি, এখন পর্যন্ত দেশে বস্তিবাসী বা নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সংক্রমণ খুবই কম। জনচলাচল ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এখন আমরা উদ্বিগ্ন। সামনের দিনগুলোতে বস্তিবাসী বা দিনমজুর পর্যায়ের মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। আর যদি সেটা হয়, তবে পরিস্থিতি দ্রুত অনেক বেশি মাত্রায় অবনতি ঘটতে পারে। ফলে আমরা এখন সেদিকেও নজর রেখে কিছু পর্যবেক্ষণকাজ শুরু করেছি।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ দপ্তরের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, গত সপ্তাহে গড় হিসাবে সামগ্রিক জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে সংক্রমণের হার ৮.৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ওই তথ্যে দেখা যায়, গত সপ্তাহে সংক্রমণ ছিল প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় এক হাজার ৩২৮ জনের মধ্যে, যা আগের সপ্তাহগুলোতে ছিল এক হাজার ২০১ জনের মধ্যে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঘটে বগুড়ায় প্রতি ১০ লাখে এক হাজার ১৩৭ জনের মধ্যে।

দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের ঘোষণা আসে। ১৮ মার্চ মৃত্যুর খবর জানায় সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শনাক্তের সংখ্যা দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৮৯ জন। মোট মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার ৮৩ জন।

বিভাগওয়ারি প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার হিসাবে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে ঢাকা বিভাগে, তিন হাজার ৪৩৩ জন। আর ঢাকা মহানগরীতে ১৩ হাজার ৯৬৮ দশমিক ৭ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৮২ দশমিক ১৩ জন। এই বিভাগে সর্বোচ্চ সংক্রমণ চট্টগ্রাম জেলায় এক হাজার ৫৪০ জন। তৃতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণ সিলেটে, ৬১৫ দশমিক ৩ জন। এই বিভাগে সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ৯৪৪ দশমিক ৫ জন। এরপর খুলনা বিভাগে ৫৭৭ দশমিক ৬ জন। এই বিভাগের মধ্যে জেলা হিসেবে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঘটেছে ঝিনাইদহে, ১০৮৩ দশমিক ৩ জন।

পঞ্চম অবস্থানে আছে বরিশাল বিভাগ, ৫৫৮ দশমিক ২ জন। এ বিভাগে বরিশাল জেলায় সর্বোচ্চ সংক্রমণ ৮৬৩ দশমিক ৯ জন। ষষ্ঠ স্থানে থাকা রাজশাহী বিভাগে সংক্রমণ প্রতি ১০ লাখে ৫৪১ দশমিক ৬০ জন। এই বিভাগে সর্বোচ্চ এক হাজার ১৩৭ জন সংক্রমিত হয়েছে বগুড়ায়। সপ্তম অবস্থানে আছে ময়মনসিংহ, প্রতি ১০ লাখে সংক্রমিত হয়েছে ৩৩৮ দশমিক ৯ জন। ওই বিভাগে সর্বোচ্চ ৪৩১ দশমিক ৮ জন সংক্রমিত হয়েছে ময়মনসিংহ জেলায়ই। সর্বশেষ অবস্থানে থাকা রংপুর বিভাগে প্রতি ১০ লাখে সংক্রমিত হয়েছে ৩০৪ দশমিক ৯ জন। এই বিভাগে সর্বোচ্চ সংক্রমণ পাওয়া গেছে রংপুর জেলায়, ৪৮০ জনে।

এ ছাড়া কক্সবাজারে প্রতি ১০ লাখে ১২০৬, নারায়ণগঞ্জে ১৬৭১, ফরিদপুরে ১৯৯৪ দশমিক ৯ জন সংক্রমিত হয়েছে।

 

 

মন্তব্য