kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ, তবু বহাল এনসিসির এমডি

জিয়াদুল ইসলাম   

২৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ, তবু বহাল এনসিসির এমডি

আদালতে রিট করে অপসারণ প্রক্রিয়া আটকে রেখে এখন আরেক মেয়াদে থাকতে তোড়জোড় শুরু করেছেন ন্যাশনাল ক্রেটিড অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। ব্যাংকের পর্ষদ থেকে এরই মধ্যে আরেক মেয়াদে থাকার অনুমোদন নিয়েও ফেলেছেন। তবে মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁর পুনর্নিয়োগের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু মোসলেহ উদ্দিন সরকারি দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে দিয়ে জোর প্রচেষ্টা ও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর এনসিসি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) পদে যোগ দেন মোসলেহ উদ্দিন। ২০১৭ সালের আগস্টের শুরুতে তিনি এমডির দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি যমুনা ব্যাংকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফরাহ মো. নাছের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ মাসেই এনসিসি ব্যাংকের এমডির পুনর্নিয়োগের বিষয়ে আবেদন আসে। কিন্তু আমরা সেটি নাকচ করে দিয়েছি।’ কী কারণে নাকচ করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন একজন এমডির বিরুদ্ধে মিডিয়ায় লেখালেখি হয়, তখন সেটি ব্যাংকের নামের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। তাহলে ওই ব্যাংকে তাঁকে নিয়োগ না দিতেই পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’

মোসলেহ উদ্দিনের পুনর্নিয়োগের আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নাকচের কথা স্বীকার করে এনসিসি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য এখন তিনি রিভিউ করানোর চেষ্টা করছেন।

গত বছরের এপ্রিলে এনসিসি ব্যাংকের এমডি মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও কর ফাঁকি এবং মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ। এর পরই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএফআইইউ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে চিঠি দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি তদন্ত চলাকালে সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্ত করা হয়নি তাঁকে। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও গত ১৫ মাসের বেশি সময় নিজ পদে বহাল তবিয়তে থেকে নজির স্থাপন করেছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সরকারি দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সখ্য আছে মোসলেহ উদ্দিনের। এ ছাড়া এনসিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ফলে তদন্তকাজে কালক্ষেপণ এবং ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে।

ব্যাংক কম্পানি আইনের ১৫(৪) ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে ব্যাংকের এমডি নিযুক্ত করা হয়। কোনো এমডির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেলে ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় বা জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

জানা যায়, বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মোসলেহ উদ্দিনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তাঁর কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। তিনি যে ব্যাখ্যা দেন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে অপসারণ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটি করা হয়। এরপর কয়েক দফা ব্যাখ্যা তলবের পাশাপাশি মোসলেহ উদ্দিনকে শুনানির জন্য ডাকা হয়। কয়েক মাস আগে কমিটি তাদের সুপারিশ গভর্নরের কাছে দাখিল করেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং এমডি অপসারণসংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান এস এম মনিরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্ট কনফিডেনশিয়াল। এটা কারো সঙ্গে শেয়ার করা যায় না।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্ট্যান্ডিং কমিটির আরেক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে স্ট্যান্ডিং কমিটিতে শুনানি চলাকালে মোসলেহ উদ্দিন যখন দেখতে পান শেষ রক্ষা বুঝি আর হচ্ছে না, তখন তিনি আদালতে রিট করে অপসারণ প্রক্রিয়া আটকে দেন। রিট আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু তিনি বিএফআইইউর প্রতিবেদন পাননি, সে জন্য স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে চাহিদামতো জবাব দিতে পারছেন না। অবশ্য আদালত বিএফআইইউকে কোনো প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলেননি। এতে রিট নিষ্পত্তিতে কালক্ষেপণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

গত বছরের এপ্রিলের দিকে অনুসন্ধান চালিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারবাজারে মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৪টি ব্যাংক হিসাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ছয়টি মেয়াদি আমানত, সীমাতিরিক্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজারে চারটি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব পরিচালিত হওয়ার তথ্য পায় বিএফআইইউ। এতে মোট ৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা (মার্কিন ডলার বাদে) অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। বিএফআইইউর পর্যালোচনায় বলা হয়, মোসলেহ উদ্দিন কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় নৈতিক স্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছেন, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ২(শ)(১) এবং ২(শ)(১৯)-এ বর্ণিত অপরাধ। এ ধরনের একজন ব্যক্তির কাছে একটি ব্যাংক তথা আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষিত নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা