kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

শিশুদের মনোজগৎ বুঝতে হবে

গোপেন কুণ্ডু

২৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিশুদের মনোজগৎ বুঝতে হবে

করোনাব্যাধির কারণে শিশু-কিশোররা শারীরিক ও মানসিক দুভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা করোনায় কম আক্রান্ত হলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অন্যান্য রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

সাধারণ শিশু-কিশোররা নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারলেও প্রতিবন্ধী শিশুরা তা পারে না। ফলে এই সময়ে প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের কষ্ট সাধারণদের তুলনায় বেশি হচ্ছে।  

করোনার মতো ভয়ংকর ব্যাধির কারণে অনেক শিশু-কিশোর টানা গৃহবন্দি থাকায় মানসিক চাপে অসহায় বোধ করছে। এতে তারা মা-বাবা বা পরিবারের বড়দের আগের চেয়ে বেশি কাছে পেতে চায়। কর্মজীবী মা-বাবা তাঁর সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। এতে তাদের অসহায়ত্ব আরো বেড়ে গেছে। 

করোনা সংক্রমণের মধ্যে অনেক অভিভাবক বাইরে বের হলেও ঝুঁকির কথা ভেবে সন্তানদের ঘরে আটকে রেখেছেন। এতে অনেক শিশু-কিশোর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। নিঃসঙ্গতার কারণে তারা করোনা আসার আগের সময়ের মতো স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছে না। অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। করোনায় বাসায় আটকে থাকায় নড়াচড়া কম হচ্ছে। এতে অনেক শিশু-কিশোরের ওজন বেড়ে যাচ্ছে। ওজন বাড়লে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে অনেক জটিল রোগ হয়ে থাকে। অনেক অভিভাবক করোনার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে মেজাজ খারাপ করছেন। এসব অভিভাবক তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে সন্তানদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন।  এতে শিশু-কিশোরদের মানসিক সংকট আরো বেড়ে গেছে। 

ভয়ংকর এ ব্যাধির কারণে আমাদের চারপাশে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে তার বেশির ভাগের জন্য কেউ আগেভাগে প্রস্তুত ছিল না। আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক সব ক্ষেত্রেই নতুন নতুন সমস্যার মূখোমুখি হতে হচ্ছে। এসব সমস্যার কারণে সন্তানের ওপরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নেতিবাচক কোনো প্রভাব যাতে না পড়ে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। এসব সংকটের কারণে সৃষ্ট নেতিবাচক ঘটনা শিশু-কিশোরকে সারা জীবনের জন্য অসুস্থ করে দিতে পারে, যা এখন বোঝা না গেলেও পরবর্তী সময়ে তার জীবনকে নষ্ট করে দিতে পারে। 

করোনাকালীন সংকটে সাধারণ শিশু-কিশোরদের ওপর যতটা নজর দিতে হবে তার চেয়ে অনেক বেশি নজর দিতে হবে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধীদের ওপর। এদের অনেকে সব কিছু বুঝতে পারলেও কথা বলতে পারে না। অনেকে বুঝতেই পারে না, কেন কষ্ট হচ্ছে। মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোররা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না। মনে রাখতে হবে খারাপ ব্যবহার করে উত্তেজিত হয়ে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। শিশু-কিশোরের সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে নজর দিতে হবে।

করোনায় শিশু-কিশোরদের অনেকে তথ্য-প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে খারাপ অভ্যাসে পড়ছে। অভিভাবকদের বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বর্তমান ভয়ংকর পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে শিশু-কিশোরদের ধীরে ধীরে অবহিত করতে হবে। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে তাদের ধৈর্য ধরে বোঝাতে হবে। পড়ালেখায় তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে। তাদের মানসিক শক্তি বাড়াতে শিক্ষণীয় কথা বলতে হবে। বিনোদন হয় এমন ঘরোয়া খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখতে হবে। মাঝে মাঝে খোলা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে। নিজে না পারলে আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে এনে সন্তানদের সঙ্গ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে আনার আগে অবশ্যই তার করোনা টেস্ট করে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে করোনার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে একা নয়, সবাইকে নিয়ে বাঁচতে হবে। সবাইকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করতে হবে। করোনা কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। তাই করোনা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ধরে নিয়ে আমাদের শিশু-কিশোরদের যত্ন নিতে হবে। 

লেখক : চেয়ারম্যান, শিশু নিউরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য