kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

কমিটি বিশাল হওয়াতেই ঢুকে পড়ে সাহেদরা

আওয়ামী লীগেই উপকমিটির জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কমিটি বিশাল হওয়াতেই ঢুকে পড়ে সাহেদরা

করোনাভাইরাস মহামারির সময় চিকিৎসা ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে নানা অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়ার পর এর মালিক মো. সাহেদকে নিয়ে দেশে নিন্দা-সমালোচনা চলছে। এই সাহেদ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। এ ঘটনা ক্ষমতাসীন দলটির জন্য বিব্রতকর বলে নেতারা মনে করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দলের ভেতরেই উপকমিটি নিয়ে আলোচনা চলছে। উপকমিটিগুলোর আকার নিয়ে অনেক নেতাই প্রশ্ন তুলেছেন। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, উপকমিটির সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট না থাকার সুযোগে ঢালাওভাবে অবাঞ্ছিত লোকজন ঢুকে পড়ছেন। এতে যেমন নেতৃত্বের মান থাকছে না, তেমনি উপকমিটিও কার্যকর হচ্ছে না। এ ছাড়া অবাঞ্ছিতরা এই পরিচয় ব্যবহার করে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ওই নেতারা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, আওয়ামী লীগের বিশাল আকারের উপকমিটিগুলো দলের জন্য অপ্রয়োজনীয় উপদ্রব হয়ে উঠছে। পুরো মেয়াদে দু-একটি উপকমিটি ছাড়া বেশির ভাগই সাংগঠনিক তেমন কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকে না। অথচ কারো কারো অপকর্মের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

যদিও সাহেদ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্যসচিব বলেছেন, এই ব্যক্তি কমিটিতে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকে দিয়ে তদবির করিয়েছেন। কিন্তু তাঁকে কমিটিতে রাখা হয়নি। এখন পর্যন্ত কমিটিও অনুমোদন পায়নি।

সূত্র মতে, উপকমিটির সদস্য হয়ে অনেক নেতাই সাংগঠনিক পরিচয়ের ভিজিটিং কার্ড বানিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তদবির ও টেন্ডার বাণিজ্যে লিপ্ত হন। কারণ দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অপকর্ম করা সহজ হয়। সে কারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা উপকমিটির আকার ছোট করার কথা বলছেন। তাঁরা সদস্যসংখ্যা এক শর নিচে রাখার পক্ষে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটিগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর। এ কমিটিগুলোর কাজের মাধ্যমে তরুণ নেতাদের বিভিন্ন বিষয়ে কাজে পারদর্শী করে গড়ে তোলা হয়। একটা সময় পর্যন্ত এ উপকমিটিগুলোতে যোগ্য ও বাছাই করা নেতাদের যুক্ত করা হতো। কিন্তু কয়েকটি উপকমিটিতে অনেক বেশি সদস্য যুক্ত করা হয়। দুঃখজনকভাবে এ সময়ে কিছু বিতর্কিত মানুষ কমিটিতে ঢুকে গেছেন। এঁদের জন্য নানা বিতর্ক উঠছে। আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে বসব।’

সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য আব্দুর রহমানও বলছেন, ‘উপকমিটির সাম্প্রতিক ঘটনায় আমি বিব্রত। এই বড় আকারের উপকমিটি যে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শুরু করেছিলেন সেটার অপব্যবহার করেছেন দলের কিছু কিছু নেতা।’

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের উপকমিটিগুলো করা হয় বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকদের কাজের সুবিধার জন্য। প্রতিটি উপকমিটির সভাপতি করা হয় দলের উপদেষ্টা পরিষদের একজনকে। সদস্যসচিব হন কেন্দ্রীয় কমিটির সংশ্লিষ্ট সম্পাদক। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আওয়ামী লীগের যাঁরা সদস্য তাঁরাও উপকমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। এর বাইরে দলের পরিশ্রমী, যোগ্য তরুণ নেতাদের উপকমিটির সদস্য করার কথা। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে এ সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। ফলে প্রভাবশালী নেতারা ইচ্ছামতো উপকমিটিতে সদস্য যোগ করেন। এই কারণে বিতর্কিত অনেকে কমিটিতে ঢুকে পড়েন।

২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলটির গঠনতন্ত্রে উপকমিটি রাখার সিদ্ধান্ত হয়। কমিটিতে যাঁরা অন্তর্ভুক্ত হন তাঁরা সবাই সহসম্পাদক পদধারী। তখন সাবেক ছাত্রনেতা, দলের ত্যাগী নেতাদের মধ্য থেকে বাছাই করে ৬০-৭০ জনকে উপকমিটির সহসম্পাদক করা হয়, যাঁদের অনেকেই পরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। পরের কমিটিতে কোনো সহসম্পাদক পদ ঘোষণা হয়নি। এরপর ২০১২ সালের সম্মেলনের পর কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ৬৬ জন সহসম্পাদকের নাম অনুমোদন দেওয়া হয়। যদিও পরে দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা নানাভাবে কয়েক শ জনকে সহসম্পাদক পদে অন্তর্ভুক্ত করে চিঠি দেন। একসময় এ সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি হয়ে যায়। সে সময়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা সহসম্পাদকের প্রকৃত সংখ্যা কত তা বলতে পারতেন না। বিরক্ত হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ধানমণ্ডিতে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘পার্টি অফিসে যার সঙ্গে ধাক্কা লাগে, সেই বলে আমি সহসম্পাদক।’

জানা গেছে, গত দুই উপকমিটিতে বিতর্কিত এবং অন্য দল থেকে আসা বেশ কয়েকজন জায়গা পান। তত্কালীন ধানমণ্ডি ৩ নম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ের প্রভাবশালী এক নেতার বাসায় বাজার-সদাইয়ের কাজ করতেন এমন ব্যক্তিও উপকমিটির সহসম্পাদক হন। সরকারি চাকরিজীবীরা সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে না পারলেও একাধিক উপকমিটিতে কয়েকজনকে স্থান দেওয়া হয়। একসময় ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কবির হোসেন, মিজানুর রহমান জনি, এসডি রুবেলও উপকমিটিতে স্থান পান। বিতর্কিত নেতা মিজানুর রহমান মিজান, নুরুন্নবী রাজু, মশিউর রহমান শিহাব, দর্জি মনিরও উপকমিটির সহসম্পাদক ছিলেন।

২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটি কী ধরনের হবে, গঠনতন্ত্রে সেটা স্পষ্ট করা হয়। ওই সময় থেকে সম্পাদকমণ্ডলীর প্রতেক সদস্যকে ঘিরে বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি করা হয়। কিন্তু উপকমিটিগুলোতে কতজন সদস্য থাকবেন, সেটা নির্দিষ্ট করা ছিল না। শুধু তিনজন করে সহসম্পাদক থাকার বিষয়টি বলা ছিল। সর্বশেষ ২০১৯ সালের সম্মেলনে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে উপকমিটিতে সহসম্পাদক পদ বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু কতজন সদস্য রাখা হবে, সেটা তখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি। উপকমিটির সভাপতি হন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। আর সদস্যসচিব সংশ্লিষ্ট সম্পাদক।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দল থেকে বের করে দেওয়ার জন্য বারবার আমাদের বলেছেন। কিন্তু তারা খুবই ধূর্ত। বিভিন্নভাবে দলের নেতাদের ব্ল্যাকমেইল করে তারা দলে থেকে যায়।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহ্মুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘আমরা যারা দলের আদর্শ ও মূল নেতার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচারণা, শোডাউন, শক্তি ও তথাকথিত গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে মরিয়া তারাই সমস্ত আগাছা, জঞ্জালের জন্য দায়ী। পৃষ্ঠপোষক মহোদয়গণ সাবধান হলেই সংকট কমে আসবে।’

 

মন্তব্য