kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

র‌্যাব সদরে পাওনাদারের ভিড়

সাহেদের প্রতারণার শিকারদের মর্মন্তুদ বর্ণনা, আকুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাহেদের প্রতারণার শিকারদের মর্মন্তুদ বর্ণনা, আকুতি

‘এই দেখেন ভাই আমার মাথা, নাক আর ঠোঁট। হাতের অবস্থাটাও দেখেন। এই যে দেখেন মেরুদণ্ডে আঘাতের চিহ্ন। এগুলো সব মাইরের দাগ। চাকরির জন্য জামানতের টাকা দিয়ে ফেরত চাইছিলাম বলে দুই দিন আটকে রেখে মিরপুরে রিজেন্টের অফিসে আমার এমন অবস্থা করেছে সাহেদ।’

র‌্যাব সদর দপ্তরের অভ্যর্থনাকক্ষে গতকাল বুধবার কথাগুলো বলছিলেন জাহিদ হাসান। কান্না লুকাতে চাইলেও পরিহিত কালো রঙের চশমার ফাঁক গলে গড়িয়ে নামছিল অশ্রু।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার পর থেকেই র‌্যাব সদর দপ্তরে প্রতারণার শিকার অনেকেই অভিযোগ করছেন। গতকাল ভোরে সাতক্ষীরায় আটকের পর সাহেদকে হেলিকপ্টারে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। এই খবরের পর ভিড় বাড়ে র‌্যাব সদর দপ্তরে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইট, পাথর, বালু অথবা নগদ টাকা নিয়ে ভুয়া চেক ধরিয়ে দিয়ে অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করেছেন সাহেদ। টাকা চাইলে হুমকি-ধমকির পাশাপাশি তাদের মারধর করতেন সাহেদ। তাঁর এই প্রতারণা অনেক বছরের হলেও ২০০৯ সালে প্রথম তাঁর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় প্রতারণার মামলা হয়।

এ সম্পর্কে র‌্যাব সদর দপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘যারা প্রতারণার শিকার হয়েছে আমরা তাদের মামলা করতে বলেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।’

জানা যায়, ২০০৮ সালে হাবিবুর রহমান নামের একজনের কাছ থেকে একটি গাড়ি বন্ধক রেখে পাঁচ লাখ টাকা নেন সাহেদ। তখন তিনি এয়ার কার্গো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। সিডরের পর কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন না জানিয়ে তিনি ওই টাকা নেন। কিন্তু পরে আর টাকা ফেরত দেননি।

গতকাল র‌্যাব সদর দপ্তরে অভিযোগ করতে এসে হাবিবুরের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্বামীর পরিচিত একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন সাহেদ। পরে টাকার দরকারের কথা বলে একটা গাড়ি বন্ধক রেখে পাঁচ লাখ টাকা নেন তিনি। তিনি টাকা না দিয়ে অগ্রিম পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক দেন। কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে দেখি, তাঁর অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। পরে জানতে পারি, আরো ১৫টি গাড়ি কিস্তিতে নিয়ে সেগুলোর বিপরীতে টাকা নিয়ে ১৫ জনকে চেক দিয়েছেন সাহেদ। কিন্তু কিস্তি পরিশোধ না করায় মামলা হয়ে যায়। ২০০৯ সালের ২০ জুলাই শাহবাগ থানায় আব্দুল রশিদ নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা মামলা করলে আমরা সবাই থানায় গাড়ি জমা দিয়ে দিই।’

সোনিয়া আরো বলেন, ‘টাকা না পেয়ে ২০১১ সালে ক্ষিলক্ষেত থানায় একটি জিডি করি। এরপর প্রায় ছয় বছর তাঁর আর কোনো খবর পাইনি। পরে একজনের মধ্যমে জানতে পারি যে সাহেদ রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে একদিন রাতে তাঁর উত্তরার অফিসে গিয়ে দেখি তাঁর চারজন বডিগার্ড। সেখানে সাহেদ আমাদের অনেক গালাগাল করেন। এ সময় নিজেকে প্রতিন্ত্রীর সমতুল্য এবং প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা বলেও পরিচয় দেন তিনি। এরপর স্থানীয় থানায় ফোন করে হুমকি-ধমকি দিয়ে ভয়-ভীতি দেখান। এরপর আর আমরা যাইনি।’

গতকাল আরো বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়। সিলেটের জৈন্তাপুরের মাওলা স্টোন ক্রাশারের মালিক হাজি সামছুল মাওলা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাহেদের সঙ্গে পাথর ব্যবসা করে আমাকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। দুই মাস ধরে গ্রামে যাইতে পারি না। ওয়ার্ক অর্ডারের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকার পাথর দিই। বিপরীতে ১০ লাখ টাকার তিনটি চেক দেন। তার মধ্যে একটা অন্য অ্যাকাউন্টের। আর তাঁর নামে দুই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা ছিল না। পরে বিভিন্ন সময় টাকা চাইলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিতেন। অথচ আমি ১৫ লাখ টাকা দেনা নিয়ে পলাতক হয়ে আছি।’

জয়নাল আবেদীন নামের এক বৃদ্ধ বালু বিক্রির ১৫ লাখ টাকা পাওনার কথা জানিয়ে গতকাল অভিযোগ করতে আসেন র‌্যাব সদর দপ্তরে। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে মেসার্স মুনা ট্রেডার্স থেকে রিজেন্ট কেসিএসকে বালু দিতে থাকি। সময়ের সঙ্গে টাকা জমতে থাকলেও সেই টাকা দিচ্ছিলেন না সাহেদ। তাঁর কাছে টাকা চাইতে গেলে নানা রকম ভয়ভীতি আর হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন।’

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা