kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

নেপথ্যের সুবিধাভোগীরা আড়ালেই থাকছেন

ওমর ফারুক   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নেপথ্যের সুবিধাভোগীরা আড়ালেই থাকছেন

অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছর যুবলীগ ও কৃষক লীগের কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তারের পর তাঁদের প্রশ্রয়দাতা এবং পেছনে থেকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সুবিধাভোগী ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালীর নাম আলোচনায় আসে। এরপর আওয়ামী লীগ দলে শুদ্ধি অভিযানের ঘোষণা দেয়। গ্রেপ্তারকৃতদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করাসহ কারো কারো বিরুদ্ধে নামমাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেসব সুবিধাভোগী আড়ালেই থেকে গেছেন। এবারও করোনাভাইরাস মহামারির এই সংকটময় সময়ে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদের প্রতারণাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর আড়ালের সুবিধাভোগীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় আবার নতুন করে আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। আলোচনায় এসেছে সরকারবিরোধী বিএনপিও।

প্রশ্রয়দাতারা আড়ালে থেকে যাওয়ার কারণে সাহেদের মতো লোকজন নতুন করে অপরাধের সুযোগ পায় বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাঁরা বলছেন, সাহেদের বিরুদ্ধে ৫০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। তিনি আগে একবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টি দেয়নি কেউই। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক করে তিনি অপরাধ করতে সাহস পেয়েছেন।

গতকাল বুধবার সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এসব বিষয় আবার আলোচনায় উঠে আসার পাশাপাশি এসব অপরাধীর শাস্তির বিষয়েও কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, যেসব অপরাধের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, সেগুলোর সাজা এ ধরনের অপরাধীদের দমনে যথেষ্ট কি না।

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান

সাংবাদিকদের বলেছেন, সাহেদ সব সময় প্রতারণা করার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতেন। তাঁর এই প্রতারণার অংশ হিসেবেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলতেন। টেলিভিশন টক শোতেও তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, এটাও ছিল তাঁর প্রতারণার অংশ।

করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করা সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসার পর র‌্যাব উত্তরা ও মিরপুরে হাসপাতালটির শাখা সিলগালা করে দেয়। তখন তাঁর প্রতারণার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির একটি অনুষ্ঠানে সাহেদ সেই কমিটির নেতাদের পাশে বসা রয়েছেন, এমন একাধিক ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিতেন। বিএনপির শাসনামলেও কয়েকজন মন্ত্রী ও হাওয়া ভবনসংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে সাহেদের ঘনিষ্ঠ ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

আওয়ামী লীগের ওই উপকমিটির সদস্যসচিব ড. শাম্মী আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সাহেদকে তাঁদের কমিটিতে নেওয়ার জন্য দলেরই অনেকে তদবির করেছিলেন। অনেক সিনিয়ররা বলেছেন। তিনি অবশ্য তাঁদের নাম বলতে চাননি। তার পরও তিনি তাঁকে কমিটিতে রাখেননি। ওই উপকমিটি এখনো অনুমোদন পায়নি।

এর আগে গত বছর ৬ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করার পর গণমাধ্যমে তাঁর প্রশ্রয়দাতা হিসেবে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর নাম আসে। যুবলীগের একই শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের খালেদকে একই কারণে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর সম্রাট ছাড়াও একে একে যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া ঠিকাদার জি কে শামীম, আওয়ামী লীগ নেতা দুই সহোদর এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়া, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, সেলিম প্রধানসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর ওমর ফারুক চৌধুরীকে সংগঠনে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। পরের কমিটিতে তিনি সংগঠন থেকে বাদ পড়েন। ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃতদের প্রায় প্রত্যেকের কাছ থেকেই আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এবার প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদের কাছ থেকেও অস্ত্র পেয়েছে তারা। গ্রেপ্তারকৃতদের অনেকেই ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে কোটি কোটি টাকা। হদিস মিলেছে ফ্ল্যাট ও বাড়ির।

ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে বেশির ভাগেই বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অর্থপাচারের মামলা হয়েছে। কয়েকজনের মামলা তদন্তাধীন। কয়েকজনের মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। কারো কোনো মামলায় এখনো সাজা হয়নি। অবশ্য সম্রাটকে ক্যাঙ্গারুর চামড়া রাখার দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। তিনি এখন হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন। একইভাবে শামীমও হাসপাতালে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাহেদ, সম্রাট, শামীম—সবাই একই সময়ের অপরাধী। সাহেদ পড়ে ধরা পড়েছে। সাহেদ, সম্রাট উপরিভাগের দৃশ্য। মূল উৎপাটন যত দিন না হবে, যত দিন না করা যাবে, তত দিন এসব সমস্যা দূর হবে না। এমন শত শত সাহেদ, সম্রাট উৎসাহিত হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই মুহূর্ত থেকে রাজনীতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একান্তে ছবি তোলা বন্ধ করা উচিত। তাঁদের সতর্ক হতে হবে। গ্রুপ ছবি হতে পারে। কিন্তু একান্তে ছবিই অপরাধীরা কাজে লাগায়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা