kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

রিজেন্ট জেকেজির প্রাণক্ষয়ী পজিটিভ নেগেটিভ খেলা

এস এম আজাদ ও লায়েকুজ্জামান   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রিজেন্ট জেকেজির প্রাণক্ষয়ী পজিটিভ নেগেটিভ খেলা

করোনা পরীক্ষার নামে রিজেন্ট ও জেকেজি যা করেছে তাকে শুধু প্রতারণা বললে ভুক্তভোগীদের সঙ্গেই প্রতারণা করা হবে। উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ইমরান খান বলছিলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতাল প্রতারণা না করলে, সঠিক পরীক্ষা করলে হয়তো আমার স্নেহের ভাইটিকে বাঁচাতে পারতাম।’

কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, তাঁর ৪৫ বছর বয়সী ছোট ভাই আরফান খানের করোনা উপসর্গ দেখা দিলে তিনি গত ৪ জুন তাঁকে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখায় নিয়ে যান। হাসপাতালের লোকজন পরীক্ষার নুমনা রাখেন। চার দিন পর রিজেন্ট পরীক্ষার ফলাফলে দেখায় ‘নেগেটিভ’। এই ফল পেয়ে পরিবারের লোকজন ধরে নেয় আরফানের স্বাভাবিক জ্বর-ঠাণ্ডা। সেভাবেই আরফান ওষুধ খান। ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে পড়লে ১১ জুন উত্তরার লোবানা জেনারেল হাসপাতালে আবার করোনার পরীক্ষা করান। ফল পজিটিভ আসে। ১৩ জুন তাঁকে ভর্তি করানো হয় কুর্মিটোলা হাসপাতালে। ১৪ জুন আইসিইউতে নেওয়া হয়। ২২ জুন মারা যান আরফান।

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ নির্বিচারে করে গেছেন এ রকম লোমহর্ষক কাণ্ড। পরীক্ষা না করেই ইচ্ছামতো কোনো রোগীকে পজিটিভ আবার কোনো রোগীকে নেগেটিভ বলা হয়েছে। জেকেজিও চালিয়েছে জীবন বিপন্ন করা এ রকম কর্ম। 

উত্তরার বাসিন্দা তারেক আহমেদ। ২৭ জুন তিনি জ্বরে আক্রান্ত হলে যোগাযোগ করেন রিজেন্ট হাসপাতালে।

এক দিন পর রাতে হাসপাতালের রাশেদ নামের একজন বাসায় গিয়ে তাঁর নমুনা সংগ্রহ করেন এবং এ বাবদ সাড়ে তিন হাজার টাকা নেন। তিন দিন পর তাঁকে পজিটিভ জানিয়ে দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হতে বলা হয়। তিনি উত্তরা শাখায় ভর্তি হন। তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এক দিন পর পরিবারের লোকদের বলা হয় রোগীর অবস্থা ভালো নয়, আমাদের এখানে আইসিইউ নেই। আপনারা রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যান। তারেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিজেন্টে চিকিৎসাবাবদ ৩৮ হাজার টাকা পরিশোধ করে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি হলে পরীক্ষার পর দেখা যায় আমার করোনা হয়নি। অথচ রিজেন্ট পজিটিভ রিপোর্ট দিয়ে আমাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করেছে এবং প্রতারণা করে টাকা নিয়েছে।’

সাংবাদিক খোকন কি তাহলে অপচিকিৎসার শিকার?

সময়ের আলো পত্রিকার নগর সম্পাদক হুমায়ূন কবির খোকন রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর স্ত্রী রিনা খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যখন খোকনকে রিজেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাই সে সময়ে খোকন অজ্ঞান ছিলেন। তাঁকে সরাসরি আইসিইউতে নেওয়া হয়। হাসপাতালের লোকেরা জানান, খোকনের করোনা হয়েছে, তবে করোনার কোনো পরীক্ষা তাঁরা করেননি। তাঁকে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে তা আমরা জানতে পারিনি। খোকন মারা যান। এরপর হাসপাতালের লোকেরা আমার ও আমার ছেলের করোনা পরীক্ষা করে। দুজনেরই পজিটিভ হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে আমার ছেলে আশরাফুলের কোনো উপসর্গই ছিল না। প্রশ্ন রেখে রিনা বলেন, ‘এখন রিজেন্ট হাসপাতালের নানা প্রতারণার বিষয় জানতে পেরে আমার মনে হচ্ছে, তা হলে কি খোকন অপচিকিৎসার শিকার? যদি তা-ই হয়, তাহলে আমি মনে করি খোকনকে হত্যা করা হয়েছে।’

করোনা চিকিৎসায় আগ্রহী বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সরকারের চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল হাসপাতালগুলো রোগীদের কাছ থেকে কোনো খরচ নিতে পারবে না। রিনা বলেন, ‘খোকনের চিকিৎসা বাবদ আমিন মোহম্মাদ গ্রুপের কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়েছে হাসপাতালের লোকেরা। ঠিক কত টাকা নিয়েছে তা আমার জানা নেই।’ আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ১৪ জন কর্মকর্তাকেও ভুয়া রিপোর্ট দেয় রিজেন্ট। ২৭ জুন তাঁদের পরীক্ষার পর ২৯ জুন সবাইকে পজিটিভ বলে জানানো হয়। সন্দেহ হলে এক দিন পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা করান সবাই। সেখানকার পরীক্ষায় সবারই নেগেটিভ আসে। গ্রুপের কর্মকর্তা স্বপ্না বেগম বলেন, ‘এক দিন পরই এমন রিপোর্ট পেয়ে আমরা হতবাক হয়ে যাই।’

ভুয়া রিপোর্টের চক্করে পড়েন অসংখ্য মানুষ : আশরাফ আলী খান (৫৭) সেতু বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক। থাকেন উত্তরায়। ২৭ জুন তিনি স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের ছয়জনের করোনা পরীক্ষার জন্য রিজেন্টে নমুনা দেন। এরপর পড়েন চরম বিপদে। আশরাফ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরীক্ষার জন্য ২৭ হাজার টাকা নেয়। তবে রশিদ দেয়নি। রিপোর্টে জানায়, আমি ও আমার স্ত্রী পজিটিভ। বাকি চারজন নেগেটিভ।’ তিনি জানান, এরপর  স্বাস্থ্যের জনস্বাস্থ্য বিভাগে (আইপিএইচ) থাকা পরিচিত এক কর্মকর্তার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, মে মাস থেকেই আইপিএইচ রিজেন্টের নমুনা পরীক্ষা করছে না। এতে তিনি রিজেন্টের রিপোর্ট নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে তারা দ্বিতীয় দফা নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে জানায়, তিনি তাঁর ছয় মাস বয়সী নাতি নেগেটিভ। বাকি চারজনই পজিটিভ। তাঁর ছেলে খান মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে রিজেন্ট হাসপাতালে দ্রুত ভর্তিও করে ফেলে। এক দিন সেখানে রেখে মেয়াদোত্তীর্ণ ইনজেকশন দিয়ে আদায় করে ৫২ হাজার টাকা। ডেঙ্গু পরীক্ষার কথা বলে তাদের ৯টি পরীক্ষা করানো হয়। এরপর অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে সবাই বাসায় আইসোলেশনে থাকছেন। আলী আশরাফ বলেন, ‘প্রতারণার চক্করে পরে আমরা বুঝলাম না কার করোনা হলো, কার হয়নি। হয়রানি, ভয় তো ছিলই। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কোনো সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলে সেটাও আমার ক্ষেত্রে আর হলো না।’

নেওয়া হয়েছে ‘গলাকাটা’ বিল : মিরপুরের ১১ নম্বর সেক্টরের ২৫ নম্বর লাইনের বাসিন্দা কামরুজ্জামান জানান, তাঁকে পজিটিভ রিপোর্ট দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার নামে দুই লাখ ৭০ হাজার লাখ টাকা বিল নিয়েছে রিজেন্ট। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই হাসপাতালে পরীক্ষাই ভুয়া। স্বপন নামে মিরপুরের আরেকজন বলেন, তিনিও ভুয়া রিপোর্টের শিকার। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার কাগজ ও রিপোর্টে রোগীর মোবাইল ফোনের নম্বর থাকার কথা। রিজেন্ট সে জায়গায় হাসপাতালের নম্বর লিখে রেখেছে। যাতে কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে আইপিএস বা স্বাস্থ্য বিভাগ যেন রোগীকে ফোন দিতে না পারে। ফোন করলে ধরত রিজেন্টের লোকজনই। 

পরীক্ষা বাতিলের পর কম্পিউটারে সাড়ে ৩ হাজার রিপোর্ট তৈরি করে রিজেন্ট : র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম কালের কণ্ঠকে জানান, রিজেন্ট হাসপাতালে ছয় হাজারের বেশি রিপোর্টে জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার সম্পূর্ণ ভুয়া বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযোগ ওঠায় গত ২৩ মে থেকে আইপিএইচ রিজেন্ট হাসপাতালের কোনো নমুনা পরীক্ষা করেনি। ওই তারিখ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত রিজেন্ট আইপিএইচের প্যাডে যত রিপোর্ট দিয়েছে তা নিজেরা কম্পিউটারে বানিয়েছে। তিনি জানান, করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে টাকা হাতাতে বিভিন্ন স্থানে মোটা অঙ্কের কমিশনের মাধ্যমে রোগী আনত রিজেন্টের সাহেদ। তাঁর কার্যালয় থেকে কমিশন  দেওয়ার একটি তালিকা পাওয়া গেছে। এত বেশি কমিশন অন্য কোনো হাসপাতাল দেয় না। 

১৬ হাজার রিপোর্টে জেকেজির জালিয়াতি : জেকেজি হেলথকেয়ারও (জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা) করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে অনেক মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে। ২৪ জুন জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে চারটি মামলা হয়। পরে গ্রেপ্তার হন তাঁর স্ত্রী ও জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী।

জেকেজির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন কামাল হোসেন নামের একজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া ও জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণের মধ্যে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয় এজাহারে। 

কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর বাড়ির মালিক ও স্ত্রীর জ্বর, সর্দি হওয়ায় কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে জেকেজির পক্ষের লোক হুমায়ুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা ছাড়াও মালিকের ছেলে, গাড়িচালক, গৃহপরিচারিকার নমুনা তিন দফায় বিজয় সরণি মোড়ে কলমিলতা মার্কেটের কাছ থেকে হুমায়ুনের লোক এসে নিয়ে যান। এ জন্য ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন পরীক্ষা বিনা মূল্যে হলেও তারা সেটি গোপন রাখে। পরে কামাল দেখেন, তাঁদের যে তারিখে রিপোর্ট করানো হয়, সে তারিখে জেকেজি স্বাস্থ্য বিভাগে এই নামে নমুনা পাঠায়নি।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ জানান, জেকেজি থেকে ২৭ হাজার রোগীকে করোনার টেস্টের রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের করোনার নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে সঠিক পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০টি রিপোর্ট প্রতিষ্ঠানটির ল্যাপটপে তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি মাঠকর্মীদের মাধ্যমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া লোকজনের নমুনা সংগ্রহ করে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে রিপোর্ট দিত।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা