kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

১৩ বছর কুকীর্তির পর অভিযানে ধরা সাহেদ

► ভুয়া হাসপাতালে ভুয়া করোনা টেস্ট
► ব্যাংকঋণ পেতে, চাকরি দেওয়া, পণ্য সরবরাহ ও কেনার নামে জালিয়াতি
► এমএলএম কম্পানি খুলে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া
► ছিল ৫৯ মামলা
► গতকাল ভোরে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকার নদীর পার থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব

নিজস্ব প্রতিবেদক ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি   

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



১৩ বছর কুকীর্তির পর অভিযানে ধরা সাহেদ

সাতক্ষীরায় আটকের পরমুহূর্তে সাহেদ। ছবি : সংগৃহীত

একবার গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন কারাভোগের পরই মিলেছিল মুক্তি। এরপর চাকরি দেওয়া, ব্যবসা, ঋণ, পণ্য সরবরাহ, পণ্য কেনাসহ বিভিন্ন কাজে জালিয়াতি করে হয়ে ওঠেন কোটিপতি ব্যবসায়ী। হাসপাতালসহ কম্পানি ও সংবাদপত্রের মালিক হয়ে টেলিভিশন টক শো করে বনে যান মিডিয়া ব্যক্তিত্বও। শত অপকর্ম আড়াল করে রাজনৈতিক দলের নেতাও সাজেন। এরপর করোনার সংকটে মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর প্রতারণা করেন।

র‌্যাবের অভিযানে অবশেষে বহুরূপী এই প্রতারকের ১৩ বছরের কুকীর্তির ইতিহাস চাউর হয় দেশবাসীর সামনে। তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা নিয়ে সারা দেশে চলছিল গুঞ্জন। ৯ দিন পরে সেই জালিয়াত মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম গ্রেপ্তার হয়েছেন। র‌্যাব জানিয়েছে, গতকাল বুধবার ভোর ৫টার দিকে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দাদল র‌্যাব-৬-এর সহায়তায় সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করেছে সাহেদকে। উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের শাখরা সীমান্তের কোমরপুর থেকে তাঁকে একটি পিস্তলসহ ধরার সময় র‌্যাব সদস্যদের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তিও হয়। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, আগের রাতে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে সাহেদের রিজেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ পারভেজকে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে নিয়ে সাতক্ষীরায় অভিযান চালানো হয়। ‘চতুর, ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু’ সাহেদ ঢাকা থেকে নরসিংদীর মাদবদী, কক্সবাজারের মহেশখালী, কুমিল্লা ও ঢাকা হয়ে সাতক্ষীরায় আত্মগোপন করেন। প্রশাসনের চোখ এড়াতে সাহেদ কখনো ভাড়া গাড়ি, কখনো ট্রাক, কখনো হেঁটে বিভিন্ন স্থানে গেছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে চুলে কলপ দিয়ে, গোঁফ কেটে নিজের চেহারায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন তিনি। বাচ্চু মাঝি নামের এক দালালের মাধ্যমে নৌকায় ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চুক্তি করে বোরকা পরে ঘাটে যান। সেখান থেকেই র‌্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি করা হয়।

গতকাল সকালেই সাহেদকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়। র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে তাঁকে মিডিয়ার সামনে নেওয়ার ‘বায়না’ ধরেন সাহেদ। দুপুরে তাঁকে নিয়ে উত্তরায় একটি অফিসে তল্লাশি চালিয়ে দেড় লাখ টাকার জাল নোট জব্দ করে র‌্যাব। বিকেলে সহযোগী মাসুদ পারভেজসহ সাহেদকে তদন্ত সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে গতকাল অস্ত্র আইনে দেবহাটা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব। ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় জাল নোটের আরেকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছিল। আজ বৃহস্পতিবার দুজনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করবে ডিবি।

সাহেদের বিরুদ্ধে ৫৯টি মামলা হওয়ার তথ্যসহ গত কয়েক দিনে শত শত ভুক্তভোগী র‌্যাবের কাছে অভিযোগ জানান। গতকাল গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে ভুক্তভোগীরা র‌্যাবের কার্যালয়ে ভিড় করেন। সাহেদ আগের মতোই পার পেয়ে যাবেন কি না, সে শঙ্কায় আছেন তাঁরা। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, সাহেদ আইনের হাত থেকে আর রেহাই পাবেন না। তদন্তের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া সাহদকে ‘এলাকার কলঙ্ক’ অভিহিত করে স্থানীয়রাও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছে।

গ্রেপ্তারের পর সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে এক বিফ্রিংয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, দেবহাটা উপজেলার শাখরা কোমরপুর সীমান্তের কোমরপুর বেইলি ব্রিজের দক্ষিণ পাশে নদীর পার থেকে সাহেদকে একটি অবৈধ অস্ত্র, তিন রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করা হয়। সাহেদ বোরকা পরে বাচ্চু দালালসহ কয়েকজন দালালের মাধ্যমে নৌকায় উঠে ইছামতী নদী পার হয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এর আগে সাহেদ তাঁর চুল ও গোঁফ ছেঁটে ফেলেন এবং চুলে কালো রং করেন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর সঙ্গে র‌্যাব সদস্যদের ধস্তাধস্তি হয়।

ব্রিফিং শেষে সকাল সাড়ে ৮টায় তাঁকেসহ র‌্যাব সদস্যরা দুটি হেলিকপ্টারে ঢাকায় ফেরেন। দুপুর ১২টার দিকে সাহেদকে নিয়ে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, সেটিও সাহেদের আরেকটি অফিস। বিকেল ৩টায় র‌্যাব সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সাহেদ করিম নিজেকে যতই ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করুক না কেন, সে মূলত চতুর, ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু।’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় এনে সাহেদ ও তাঁর সঙ্গী মাসুদকে নিয়ে অভিযানে যায় র‌্যাব। সেখান থেকে এক লাখ ৪৬ হাজার টাকার জাল নোট জব্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ ও ভুক্তভোগীর প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্তকারীর কাছে তাকে হস্তান্তর করব। তাঁরা দেখবেন। অনেক ভুক্তভোগী আমাদের কাছে এসেছেন। তাঁদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি, সহায়তাও করছি।’ ইন্ধনদাতারের গ্রেপ্তার এবং আরো অস্ত্র উদ্ধারের প্রশ্নে র‌্যাব ডিজি বলেন, ‘আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। এমন কিছু তথ্য থাকলে নিশ্চয়ই মেধাবী তদন্ত কর্মকর্তা তা দেখবেন।’

গতকাল বিকেল ৫টার দিকে র‌্যাব সাহেদ ও মাসুদকে মিন্টো রোডে ডিবির কার্যালয়ে হস্তান্তর করে। এ সময় র‌্যাব ও ডিবির সদস্যরা সাহেদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। পরে ফের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহাবুবুল আলম বলেন, আসামিদের আজ আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে।

র‌্যাবের বর্ণনায় সাহেদের ৯ দিন : র‌্যাবের এডিজি (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেছেন, ‘ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সাহেদের কাছাকাছি কয়েকবার পৌঁছানো সম্ভব হলেও গ্রেপ্তার এড়াতে পেরেছেন তিনি।’ র‌্যাবের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত ৬ ও ৭ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে ধারাবাহিক অভিযান চললেও ঢাকায়ই অবস্থান করেন সাহেদ। ৭ জুলাই রাতে তিনি রিজেন্টের এমডি মাসুদকে ফোন করে তাঁর ভায়রা গিয়াসকে সঙ্গে নিয়ে নিজের একটি গাড়িতে করে নরসিংদীর মাধবদী যান। সেখানে রিজেন্টের এক কর্মীর বাসায় অবস্থান করেন। ৮ জুলাই রাতে নিজের গাড়িতে করে কক্সবাজারের মহেশখালীতে যান। সেখানে সাহেদের সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের ঠিকাদারি কাজ আছে। ওই এলাকায় এক দিন অবস্থান করে নিজের গাড়ি রেখে গিয়াসের গাড়িতে ৯ জুলাই রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করেন। কুমিল্লায় আসার পর পথে তল্লাশির মুখে পড়তে পারেন ভেবে বিরতি দেন। এরপর গাড়ি ছেড়ে পণ্যবাহী ট্রাকে চেপে ঢাকায় আসেন। ওই সময় কুমিল্লায় র‌্যাব অভিযান চালালেও তাঁকে পায়নি। ঢাকায় ফিরে অনেকের সঙ্গে কথা বলেও রেহাই পাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাননি সাহেদ। ১০ জুলাই ভাড়া করা গাড়িতে প্রথমে মানিকগঞ্জে যান। সেখান থেকে আরেকটি ভাড়া করা গাড়িতে সাতক্ষীরা যান। ১১ জুলাই সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি চাচা, খালুসহ কয়েকজনের বাসায় যান। তাঁরা সাহেদকে বাসায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে দেননি। র‌্যাবের সূত্রে দাবি, মঙ্গলবার বাচ্চু মাঝির সঙ্গে নিজে চুক্তি করে গতকাল ভারতে যেতে চেয়েছেন সাহেদ। একই পদ্ধতিতে বাচ্চু মাঝির সহায়তায় ২০১১ সালে সাহেদ আরেকবার ভারতে যান।

বিচার চায় এলাকাবাসী : সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল আলীম বলেন, তাঁদের এলাকায় বাচ্চু দালাল নামের এক নৌকার মাঝি ছিলেন। তিনি সাত-আট বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর ছেলে সুব্রত এখন নৌকার মাঝি হিসেবে লোকজন পারাপার করে থাকেন। তরিকুল নামের এক মাঝি বলেন, সীমান্তরক্ষীদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে নদীপথে অনেকেই নৌকায় নদী পার হয়ে ভারত-বাংলাদেশে যাওয়া-আসা করে। তাঁর জানা মতে বাচ্চু নামের কোনো দালাল নেই।

সাহেদের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের কামাননগরে। সব জমি বিক্রি করে অনেক আগেই তাঁরা ঢাকায় থাকা শুরু করেন। সাতক্ষীরা নাগরিক আন্দোলন মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান মাসুম ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, সাহেদকে সাতক্ষীরার সবাই প্রতারক হিসেবে চেনে। তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

প্রসঙ্গত, গত ৬ জুলাই উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে জালিয়াতির ভয়াবহ আলামত মেলে। এরপর তদন্তকালে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে প্রতারণার তথ্য প্রকাশ পায়। গতকাল পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ৫৯টি মামলা, তিনজন গোপন স্ত্রী, শতকোটি টাকা আত্মসাৎ, পাওনাদারদের নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। করোনায় জালিয়াতির মামলায় তাঁকেসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা