kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

স্বাস্থ্য খাতে বের হচ্ছে নিত্যনতুন দুর্নীতি

৪ লাখ টাকার ক্যানুলা কিনতে সাড়ে ৯ লাখ!

তৌফিক মারুফ   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৪ লাখ টাকার ক্যানুলা কিনতে সাড়ে ৯ লাখ!

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি, জালিয়াতি বা কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে। ফাঁস হচ্ছে একের পর এক অপকর্মের তথ্য। বেরিয়ে পড়ছে থলের বিড়াল। সর্বশেষ ফাঁস হওয়া ঘটনায় জানা গেছে, করোনা রোগীদের চিকিৎসায় কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থাপনার জন্য ৫০০টি হাই ফ্লো নজেল ক্যানুলা কেনার ক্ষেত্রেও বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দরে ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। কাজ পেয়েছিল ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা আসলামুল হকের মালিকানাধীন ‘মাইশা-রাও-টেলসা জেভি’ নামের প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি ধরা পড়ার পর এরই মধ্যে ওই ক্রয়াদেশ বাতিল করা হয়েছে।

তবে সংসদ সদস্য আসলামুল হক কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেছেন, ‘কার্যাদেশ পাওয়ার পর আমি খোঁজখবর নিয়ে যখন জানতে পারি, কেনুলার দাম প্রকৃত দামের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ধরা হয়েছে, তখন আমি নিজেই কার্যাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করি। তার ভিত্তিতেই সিএমএসডি (কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) ওই আদেশ বাতিল করেছে। আমরা আমাদের কার্যাদেশ নিজেরাই প্রত্যাহার করে নিয়েছি।’ বিষয়টি নিয়ে সিএমএসডি সূত্র জানায়, এখন নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয় পর্যবেক্ষণ করছে এমন একাধিক সূত্র জানায়, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে থেকেই এই খাতে দুর্নীতি চলছিল এক ধাঁচে। আর করোনা সংক্রমণের পর জরুরি পরিস্থিতিতে কেনাকাটার সুযোগে দুর্নীতিবাজ ও প্রতারকচক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে। করোনাভাইরাস পরীক্ষায় কিটের দর নিয়ে যেমন কেলেঙ্কারি ঘটে, তেমনি তারও আগে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীসহ আরো বেশ কয়েকটি বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়ে।

জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, মহামারির সুযোগ নিয়ে যেভাবে একদল দুর্বৃত্ত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য খাতের ভেতরে ও বাইরে, তাদের যেকোনো মূল্যে দমন করতে না পারলে সামনে পরিণতি আরো খরাপ হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, দুর্নীতি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এরই মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে গোপন ও প্রকাশ্য অভিযান। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির গডফাদার বলে পরিচিত মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু ও তাঁর সিন্ডিকেটের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুদক যেমন তৎপরতা শুরু করেছে, একই সঙ্গে দুদকের নির্দেশ অনুসারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। পাশাপাশি র‌্যাবের অভিযানে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি গ্রুপের প্রতারকচক্রের কয়েকজন আটক হয়েছে। রিজেন্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম এখনো ধরা না পড়লেও জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা এবং তাঁর স্বামী, একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ চৌধুরীসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ ছাড়া আরেক অভিযানে গত রবিবার ডেমরা এলাকায় ভুয়া চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সিলগালা করা হয়েছে তাঁর অবৈধ হাসপাতাল। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এমন আরো বেশ কয়েকটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানা গেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে।

এ ছাড়া করোনা পরীক্ষার অনুমতি নিয়েও তা না করায় এরই মধ্যে পাঁচটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এ কাজের অনুমতি স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে কেনাকাটার ক্ষেত্রে চলছে কড়া নজরদারি। দরপত্রগুলো নিয়ে পুনরায় যাচাই-বাছাই চলছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যেসব শাখায় কেনাকাটা কিংবা হাসপাতালের অনুমতি নিয়ে অনিয়ম ঘটেছে, সেসব শাখার পরিচালকসহ অন্যদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং শিগগিরই তাঁদের কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানা গেছে মন্ত্রণালয় সূত্রে। এমনকি এসব কাজে সংশ্লিষ্ট থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারো কারো ওপর নজর রাখা হচ্ছে বলেও ওই সূত্র জানায়।

এর আগে মাস্ক ও পিপিই নিয়ে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরপর মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজির অনুমোদন দেওয়ার বিষয়েও চলছে অনুসন্ধান। রিজেন্ট হাসপাতালের অনুমোদন দিতে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল বলে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেওয়ায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। আজ-কালের মধ্যে মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ওই ব্যাখ্যা দেবেন বলে জানা গেছে অধিদপ্তর থেকে।

এদিকে হাসপাতালের অনিয়ম, কভিড চিকিৎসা ও পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম পালন করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গতকাল সোমবার দিনভর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সময় কাটান র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্টেট সরোয়ার আলম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে আমাদের সহায়তা করছে, তবে এটা আরো বাড়ানো উচিত। এ ছাড়া তাদের বিভিন্ন শাখার মধ্যে কারিগরিভাবে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। একই ঘাটতি রয়েছে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয়ের কিছু ক্ষেত্রেও। এসব কারণে ভালো কিছু উদ্যোগের সাফল্যও বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা তাদের এসব ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়েছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছি।’

সিএমএসডি সূত্র জানায়, কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনার নানা ক্ষেত্রে কেনাকাটায় অনিয়ম ও অতিরিক্ত দরের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর এখন এসংক্রান্ত প্রতিটি দরপত্র অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই বেরিয়ে আসছে একের পর এক থলের বিড়াল। বিশেষ করে সিএমএসডির নতুন পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় শুরু হয় এক ধরনের শুদ্ধি অভিযান। এ ক্ষেত্রে প্রথম ধাপেই অতিরিক্ত দর নিয়ে প্রশ্ন ও অভিযাগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া বিল আটকে দেওয়া হয়। দুদক থেকেও তদন্ত শুরু হয়। এ সময়ই আরো খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রায় দ্বিগুণ দরে কিট কেনার বিষয়টি। এর পরই করোনা রোগীদের কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সুবিধার জন্য জরুরি হয়ে ওঠা হাই ফ্লো নজেল ক্যানুলা কেনার প্রক্রিয়ায়ও অতিরিক্ত দরের বিষয়টি প্রকাশ পায়। গত ২৪ জুন ৫০০ হাই ফ্লো নজেল ক্যানুলা (নিউজিল্যান্ডের ফিশার অ্যান্ড প্যাকেল হেলথ কেয়ারের) সরবরাহ করার জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয় সংসদ সদস্য আসলামুল হকের প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিটি যন্ত্রের দাম ধরা হয় সাড়ে ৯ লাখ টাকা করে। মোট দাম ধরে দেওয়া হয় ৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

তবে সংসদ সদস্য আসলামুল হক কালের কণ্ঠকে নিজে থেকেই বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠান স্থানীয় যে এজেন্টের মাধ্যমে ওই হাই ফ্লো নজেল ক্যানুলা সংগ্রহ করে সরকারকে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল, সেই এজেন্ট আরো বেশি দাম ধরেছিল। পরে আমরা কমিয়ে প্রতিটি সাড়ে ৯ লাখ করেছিলাম। কিন্তু কার্যাদেশ পাওয়ার পর আমি জানতে পারি, নিউজিল্যান্ড থেকে আমদানির সব খরচ হিসাবের পরও প্রতিটির দর সর্বোচ্চ চার-সাড়ে চার লাখ টাকার মতো হয়। এর পরই আমি এই কার্যাদেশ নিজে থেকেই প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ এত অস্বাভাবিক লাভ খেতে চাই না। এই দুর্যোগের সময় এটা ঠিক না।’ তিনি স্বীকার করেন, ওই ক্রয়াদেশ অনুসারে তিনি যন্ত্র সরবরাহ করলে তাঁর ২৫ কোটিরও বেশি টাকা অতিরিক্ত আয় হতে পারত। তিনি জানান, তাঁর একই প্রতিষ্ঠান করোনা চিকিৎসার কাজে আরো দুটি আইটেম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সরবরাহ করার কার্যাদেশ পেয়েছে, যে কাজ এখন চলমান। আর ওই সব যন্ত্রের দর ঠিক আছে। খুবই ন্যূনতম দরে তিনি ওই যন্ত্র সরবরাহ করছেন। 

সিএমএসডির পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠ’র কাছে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে সিএমএসডির আরেক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, শুধু দর কমবেশিই নয়, এর সঙ্গে ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ রেষারেষির বিষয়ও জড়িয়ে গেছে। এজেন্ট এর আগে দেশে আরো বেশি দরে ওই একই কম্পানির একই মেশিন দিয়েছে। কিন্তু পরে দর কমিয়ে দেওয়ায় এজেন্ট কম দরে ওই যন্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিয়েছে, যা উপেক্ষা করে ওই যন্ত্র সরবরাহ করতে পারছে না বলেই কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা বাধ্য হয়ে কার্যাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা