kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

জুলাইজুড়েই ‘দাপট’ দেখাতে পারে বন্যা

► ভাসতে পারে ২৫ জেলা
► নতুন করে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি
► বাড়ছে ভোগান্তি, অপ্রতুল ত্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জুলাইজুড়েই ‘দাপট’ দেখাতে পারে বন্যা

পুনশ্চ : প্রথম দফার বন্যায় গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার অনেক গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার পানি বাড়ায় এমন দশা হয়েছে যে এখন সাঁকোতে করে সড়ক পার হতে হচ্ছে। গতকাল হলদিয়া থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর দেশে ভারি বর্ষণের কারণে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে বন্যা পরিস্থিতি। প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। এতে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। দ্বিতীয় দফার এই বন্যা দেশের কমপক্ষে ২৫ জেলায় আঘাত হানতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এবারের বন্যা হবে দীর্ঘমেয়াদি। জুলাইজুড়েই দাপট দেখাতে পারে বন্যা। এতে মানুষের ভোগান্তি হবে বেশি।

গত শুক্রবার থেকে দ্বিতীয় দফায় বন্যার কবলে পড়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জ ও সিলেট। পরে তিস্তা ও ধরলার পানি বেড়ে যাওয়ায় বন্যা দেখা দেয় উত্তরের জনপদ নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, জামালপুরসহ আরো কয়েকটি জেলায়। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, দিন যত যাবে, বন্যার পানি ঢুকতে পারে নতুন নতুন জেলায়। আজ সোমবার দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলো, বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, মানিকগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যমুনা নদীর কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে এবং পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে।

এদিকে বন্যায় বিপাকে পড়েছে বানভাসি সাধারণ মানুষ। দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর খাবার সংকট। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগব্যবস্থা। ভেসে গেছে মাছের ঘের। কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাঠে এখন আউশ ধান। বীজতলায় বীজ ক্ষতির মুখে পড়েছে। গ্রীষ্মকালীন শাকসবজিও এখন মাঠে। পাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বন্যায়। এখন পর্যন্ত ১৬টি স্টেশনে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় সারা দেশেই বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভারি বর্ষণ হচ্ছে। আবহাওয়া অফিসের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ জানান, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় আজও দেশের প্রায় সব জেলাতেই বৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের সাঙ্গু, হালদা, মুহুরী ও মাতামুহুরী নদীর পানি সমতল থেকে দ্রুত বাড়তে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি আরো বাড়তে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, নাটোর, সিলেট ও নেত্রকোনার বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল থেকে বাড়ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। সুরমা নদীর কানাইঘাট কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি ৮০ সেন্টিমিটার বিপত্সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর ডালিয়া স্টেশনে বিপত্সীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৮ সেন্টিমিটার এবং ধরলার পানি বিপত্সীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে এসব নদ-নদী অববাহিকার দুই শতাধিক চর ও নদী সংলগ্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৭০ হাজার মানুষ। ঘরবাড়িতে পানি উঠায় অনেকেই রাস্তা ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ। ধরলার পানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় রাজারহাটের ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ার চর ও সদর উপজেলার সারডোব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের মুখে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার ১৯টি পয়েন্টে নদীভাঙন চলছে। এর মধ্যে ১১টি পয়েন্টে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের চর ও নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, গতকাল বিকেল ৩টার হিসাব অনুযায়ী যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের ১৫ ইউনিয়নের ৯৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত এলাকার ৭৭ হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।

রংপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। আরো বেশি দুর্ভোগে পড়েছে পানিবন্দি পরিবারগুলো। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীভাঙন। খাবার সংকটসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের হাহাকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪ জলকপাটের সব কটি খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

এদিকে লালমনিরহাটে তিস্তার পাশাপাশি ধরলা নদীর পানিও বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বিকেলে শিমুলবাড়ী পয়েন্টে নদীটির পানি বিপত্সীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে বিকেলে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে (ডালিয়া) তিস্তার পানি বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ২২ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত শনিবার বিকেল ৩টা থেকে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার চারটি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক।  বানভাসিরা ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে আছে তারা।

ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার নেতাই নদের বেড়িবাঁধ ভেঙে বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অসংখ্য পুকুর ও মত্স্যঘের বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবার।

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের বন্দ উষান গ্রামে পাহাড়ি ঢলে গতকাল ভোরে বেড়িবাঁধ ভেঙে ১৫ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ওই গ্রামের সব কটি গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নেত্রকোনা জেলার উপপ্রকৌশলী মো. রহিদুল হোসেন খান জানান, দ্রুত বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে কালনী, কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল বিকেল থেকে কুশিয়ারার পানি আজমিরীগঞ্জ ও পাহাড়পুর অংশে দ্রুত বাড়ছে।

সুনামগঞ্জে ১০ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যায় আরো দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। বন্যার পানিতে বিশ্বম্ভরপুর ও দিরাইয়ে দুই শিশু এবং শাল্লায় এক যুবকসহ তিনজন মারা গেছে। ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র খুঁজছে মানুষ। ৮১টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ এখন দুর্ভোগের মুখে পড়েছে।

এদিকে জগন্নাথপুরের নিম্নাঞ্চল ফের বন্যাকবলিত হয়েছে। গত দুই দিনে কমপক্ষে ৪০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বন্যায় গৃহহীন হয়ে পড়া শতাধিক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় তলিয়ে গেছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আমাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা