kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

সিলেটে প্রতিবাদী শ্রমিক নেতাকে হত্যা, অবরোধ

সিলেট অফিস   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সিলেটে প্রতিবাদী শ্রমিক নেতাকে হত্যা, অবরোধ

সিলেট জেলা ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন রিপনকে (৪০) ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে নগরের দক্ষিণ সুরমার বাবনা পয়েন্টে এ প্রতিবাদী নেতাকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে উত্তাল সিলেট নগর। রাতেই শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। গতকাল শনিবার দুপুর ২টার দিকে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তিন শর্তে অবরোধ প্রত্যাহার করেছেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় রিপনকে খুন করা হয়েছে বলে ধারণা সহকর্মীদের।

এদিকে শ্রমিক নেতা রিপন হত্যার ঘটনায় ১৩ জনের নামে মামলা করেছেন তাঁর স্ত্রী ফারজানা আক্তার তমা। পুলিশ সাদ্দাম ও নোমান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। নিহত ইকবাল হোসেন রিপন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার খোজারখলা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে। তাঁর একটি কন্যাসন্তান আছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে শ্রমিক নেতা রিপন দক্ষিণ সুরমার যমুনা অয়েল ডিপো সংলগ্ন নিজের দোকান বন্ধ করেন। এরপর সহযোগী বাবলা মিয়াকে নিয়ে তিনি পিরোজপুরের পূর্ব খোজারখলার বাসায় ফিরছিলেন। বাবনা পয়েন্টের সিতারা হোটেলের সামনে আসামাত্র সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন রিপন। বাবলা এগিয়ে এলে তাঁকেও আহত করে দুর্বৃত্তরা। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়। সেখানকার চিকিৎসক রিপনকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা দক্ষিণ সুরমার চণ্ডিপুল, হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও বাবনা পয়েন্টে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। গতকাল সকালে এসব স্থানে ট্যাংক লরি আড়াআড়িভাবে রেখে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চণ্ডিপুল থেকে ওসমানীনগর পর্যন্ত গাড়ির দীর্ঘ সারি  লেগে যায়। প্রশাসনের আশ্বাসে দুপুর ২টার দিকে অবরোধ তুলে নেন শ্রমিকরা।

এ বিষয়ে বিভাগীয় ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের (২১৭৪) লাইন সম্পাদক কবীর খান বলেন, ‘বাবনা পয়েন্টে শ্রমিক নেতা রিপনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় আমরা অবরোধ করেছিলাম। পরে প্রশাসনের আশ্বাসের ভিত্তিতে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে।’

অবরোধ তুলে নিলেও আন্দোলনরত শ্রমিকরা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, ইন্ধনদাতা রেলওয়ের প্রকৌশলী আলী আকবরকে গ্রেপ্তার এবং দক্ষিণ সুরমা থানার ওসিসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করতে হবে।

যে কারণে খুনের ঘটনা : বাবনা পয়েন্টের সাধুরবাজারসংলগ্ন রেলওয়ের যমুনা ওয়েল ডিপোর পাশে ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য মো. ইউনুস মিয়ার তেল বিক্রির দোকানে গত ২৭ রমজান চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় এজাজুল, রিমু, মুন্নাসহ সাত-আট জনের সন্ত্রাসীরা সেদিন এসে প্রথমে টাকা দাবি করে। টাকা না দেওয়ায় তারা ইউনুস ও তাঁর শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে দোকানের ক্যাশ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলেও পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এর প্রতিবাদে মুখর ছিলেন জেলা ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল আহমদ রিপন। আসামিদের গ্রেপ্তার করতে তিনি পুলিশ প্রশাসনকে বারবার তাগাদা দেওয়াসহ নানা পদক্ষেপ নিয়ে এ বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। এ নিয়ে আন্দোলনের কথা থাকলেও ঈদ ও করোনা পরিস্থিতির কারণে কোনো কর্মসূচি দেওয়া যায়নি। কিন্তু রিপন প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। আর এর জেরেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে মনে করছেন শ্রমিক নেতারা।

বিভাগীয় ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. মনির হোসেন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমির আলীসহ শ্রমিক নেতারা বলেন, প্রতিবাদী হওয়ার কারণেই শ্রমিক নেতা রিপনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এজাজুল, রিমু, মুন্নার নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী দল। ছিনতাইয়ের ঘটনার পর সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর হলে আজ রিপনকে প্রাণ দিতে হতো না। রেলওয়ে প্রকৌশলী আলী আকবরকে সন্ত্রাসীদের ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করে শ্রমিক নেতারা তাঁকে গ্রেপ্তারেরও দাবি জানান।

এ বিষয়ে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু সরকার বলেন, ‘আমার এক শ্রমিক ভাই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন। আমরা শ্রমিক সংগঠন এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অতিসত্বর দোষীদের গ্রেপ্তার করা না হলে সিলেট বিভাগজুড়ে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

মামলা দায়ের : সিলেট জেলা ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন রিপন হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী ফারজানা আক্তার তমা বাদী হয়ে গতকাল সকালে দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে অচেনা আরো পাঁচ-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় সিলেট রেলওয়ের স্টেশন মাস্টারসহ একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন বরইকান্দি ১ নম্বর রোডের মৃত ফরিদের ছেলে ইজাজুল (২৮), মৃত ফারুক মিয়ার ছেলে রিমু (২৮), মৃত আব্দুল করিম মনজ্জিরের ছেলে মুহিবুর রহমান মুন্না (৩০), মৃত আসদ্দর আলীর ছেলে মোস্তফা (৪০), মৃত বশির মিয়ার ছেলে মিন্টু (৩৮), লিলু মিয়ার ছেলে সেবুল (২৩), চান মিয়ার ছেলে কাইয়ুম (২৮), ফারুক মিয়ার ছেলে বদরুল (২৮), মৃত ফরিদ মিয়ার ছেলে ইসমাইল (৩০), স্থানীয় সাঙ্গু গ্রামের মৃত কবির মিয়ার ছেলে নোমান (৩৯), রেলওয়ে আইডাব্লিউ শাখার আকবর হোসেন মজুমদার (৪৮), সিলেট রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মতিন ভুঁইয়া (৫৫) ও ওয়ার্কার সুপারভাইজার শহিদুল হক (৫৮)।

দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি খায়রুল ফজল জানান, শ্রমিক নেতা হত্যা ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলা হয়েছে। এ মামলার এজাহার নামীয় সাদ্দাম ও নোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তা ছাড়া অন্যদের গ্রেপ্তারেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার পিপিএম জানান, শ্রমিক নেতা রিপন খুনের ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ট্যাংক লরি শ্রমিক নেতাদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের পর তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহার করেছেন। হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে দক্ষিণ সুরমা পুলিশ।

 

মন্তব্য