kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

কূটনীতিকদের অভিমত

ভারতের সীমানা প্রশ্নে মিত্রদের মতানৈক্য দূর হওয়া দরকার

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভারতের সীমানা প্রশ্নে মিত্রদের মতানৈক্য দূর হওয়া দরকার

সম্প্রতি লাদাখে সীমান্ত বিরোধের জেরে মুখোমুখি অবস্থান নেয় ভারত ও চীন। উভয় দেশই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) কাছে সেনা মোতায়েন করলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে গত ১৫ জুন চীনা সেনাদের সঙ্গে হাতাহাতিতে নিহত হয় ভারতের ২০ জোয়ান। দিল্লির দাবি, সংঘর্ষে চীনেরও অনেক সেনা নিহত হয়েছে। কিন্তু চীন এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কিছু জানায়নি।

মূলত লাদাখের গালওয়ান উপত্যকা নিয়ে বিরোধ ভারত ও চীনের। চীন এটিকে নিজের বলে দাবি করছে। অন্যদিকে ভারত সে দাবি উড়িয়ে দিচ্ছে। চীনের আচরণকে ‘আগ্রাসী’ বলে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তারা বিতর্কিত এসব অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণে উভয় দেশকেই আলোচনার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

ভারতের প্রতি বিশেষ সহমর্মিতা জানিয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত অংশীদারি জোরদারের লক্ষ্যে গঠিত চতুর্দেশীয় সুরক্ষা সংলাপ ফোরাম কোয়াডের (কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ) মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। সামরিক, ভূ-রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে এ ফোরাম গুরুত্বপূর্ণ। সহমর্মিতা জানালেও ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা নির্ধারণে, অর্থাৎ জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের বিতর্কিত বিভিন্ন অঞ্চলের সীমানা ও মালিকানা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কোয়াডভুক্ত তিন দেশের তিন রকমের অবস্থান রয়েছে।

ভারতের মানচিত্র তথা অখণ্ডতা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তিন দেশের এই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দূর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ভারতের অনেক কূটনীতিক। সম্প্রতি ব্যাপারটি নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত দেশটির শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউট মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের (এমপি-আইডিএসএ) মহাপরিচালক সুজন আর. চিনয় এক লেখায় এ ব্যাপারে সারগর্ভ আলোচনা তুলে ধরেন। এমপি-আইডিএসএর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই নিবন্ধে কোয়াড মিত্ররা ভারতের অখণ্ডতার প্রশ্নে কে কোন ধরনের অবস্থান অবলম্বন করে তা পর্যালোচনা করে বলা হয়, চীন যখন ভারতীয় সীমান্তে আগ্রাসী হয়ে উঠেছে তখন এ পর্যালোচনা বিশেষ তাৎপর্যময়।

যুক্তরাষ্ট্র

চীনা আগ্রাসনের মুখে ১৯৬২ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু এক চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে সামরিক সহায়তা চান। কিন্তু সে সময় দিল্লির প্রতি সহানুভূতিশীল যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেওয়ার আগেই চীনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছে ভারত। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের ওপরই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে বঙ্গোপসাগরে পরমাণুচালিত বিমানবাহী সপ্তম নৌবহর পাঠায়। ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালানোয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের মুখোমুখি হয়ে শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের পিছু হটায় পর্দার আড়াল থেকে ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্র।

বর্তমানে যৌথ সামরিক মহড়া ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মানচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা কাশ্মীরকে একটি বিতর্কিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। তারা কাশ্মীরকে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে তিন ভাগে বিভক্ত হিসেবে দেখে। সিয়াচেন হিমবাহ ভারত নিয়ন্ত্রিত ও জম্মু-কাশ্মীরের অখণ্ড অংশ হলেও মানচিত্রে এটিকে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধপূর্ণ এলাকা হিসেবে বর্ণনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে তারা নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।

এ ছাড়া চীনের দখলে থাকা আকসাই চীনকে বিতর্কিত অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করেছে সিআইএ। অন্যদিকে তাদের মানচিত্রে অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অখণ্ড অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি লাদাখে চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনাকালে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ভারতীয় সেনাদের নিহত হওয়ার ঘটনায় সহমর্মিতা জানান এবং সীমান্ত বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব-এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ব্যুরোর সহকারী সচিব ডেভিড আর. স্টিলওয়েল ভারত, দক্ষিণ চীন সাগর এবং এ অঞ্চলে অন্যান্য ইস্যুতে চীনের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন।

অস্ট্রেলিয়া

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে কাছাকাছি এসেছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও জোরদার হচ্ছে। ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারির প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিএসপি চুক্তিতে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কের বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের জেরে গালওয়ান উপত্যকায় নিহত ভারতীয় জোয়ানদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বৈদেশিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য বিভাগের (ডিএফএটি) ওয়েবসাইটে জিওসায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার তৈরি করা দেশটির সরকারি পর্যটন মানচিত্রে দেখা যায়, তারা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অংশ বলে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীর ও অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের এবং আকসাই চীনকে চীনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আকসাই চীন অঞ্চলের প্রশ্নে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলকে বিতর্কিত বলে চিহ্নিত করেছে।

জাপান

অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা সহায়তাসহ বিশেষ কৌশল ও বৈশ্বিক অংশীদারির ইস্যুতে জাপান প্রশ্নাতীতভাবে বর্তমানে ভারতের ঘনিষ্ঠতম মিত্র। ভারতের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী জাপান বলতে গেলে ভারতের প্রতিটি বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের অংশীদার। এ ছাড়া ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় মালাবার নৌ মহড়া চুক্তির স্থায়ী অংশীদার এ দুই দেশ। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সরকারি পর্যটন মানচিত্রে দেখা যায়, তারাও অস্ট্রেলিয়ার মতো ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখাকে কারাকোরাম পর্বতমালায় চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়া জাপানও আকসাই চীন অঞ্চলকে চীনের অখণ্ড অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গালওয়ানে সীমান্ত বিরোধের জেরে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের সংঘর্ষের পর এক বিবৃতিতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে এ পরিস্থিতির সমাধান হবে। এরপর গত ৩ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে ভারতে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত এইচ ই সাতোশি সুজুকি এক বার্তায় লেখেন, জাপান আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এ পরিস্থিতির সমাধান চায়। এ ইস্যুতে জাপান কোনো পক্ষের একপেশে পদক্ষেপ সমর্থন করে না বলেও জোর দিয়ে জানান তিনি।

উপসংহার

পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে দিন দিন ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক গভীরতর হচ্ছে। এ অবস্থায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত স্বার্থেই মিত্র দেশগুলো ভারতের সীমান্তকে কিভাবে চিহ্নিত করে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া ভারতের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। সন্ত্রাসবাদ, জম্মু-কাশ্মীর ইস্যুতে সাংবিধানিক পরিবর্তনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতেই এসব দেশ ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিক প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রমবর্ধমান যৌথ ভূ-কৌশলগত স্বার্থের মুখে এ তিন দেশেরই উচিত এখনই ভারতের মানচিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের দীর্ঘদিনের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া। বিশেষ করে, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার দিক দিয়ে যথাযথভাবে ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে এর শুরু হতে পারে। তাদের উচিত কারাকোরামের বদলে এনজে৯৮৪২ পয়েন্টে ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা চিহ্নিত করা। এতে তারা অন্তত এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাতারে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে। সর্বোপরি জাতিসংঘের মানচিত্রেও এনজে৯৮৪২ পয়েন্টকে এ দুই দেশের নিয়ন্ত্রণ রেখা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

 

মন্তব্য