kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

প্রণোদনার ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর গড়িমসি

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের অনীহার অভিযোগ

জিয়াদুল ইসলাম   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




প্রণোদনার ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর গড়িমসি

এইচএম রহমান অটো সেন্টার ও পরিবহন নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে মো. মহিউদ্দিনের। করোনা মহামারিতে অন্য অনেকের মতো তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত। ব্যবসা জিইয়ে রেখে অস্তিত্ব রক্ষা করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় তিনি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিতে আগ্রহী। চতুর্থ প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ফেনী শাখার নিয়মিত গ্রাহক তিনি। প্যাকেজের আওতায় ঋণের জন্য ওই শাখায় ৮-১০ বার যোগাযোগ করেও কোনো আশ্বাস মেলেনি। এ অবস্থায় গত ২৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকে তিনি একটি অভিযোগ দাখিল করেছেন।

করোনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় এক লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হবে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মো. মহিউদ্দিনের মতো অনেক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাই প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের জন্য আবেদন করে মাসের পর মাস ঘুরছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে ঋণ পাওয়া নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় গত ৯ জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু দুটি প্যাকেজ ছাড়া অন্য প্রায় সব প্যাকেজের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতি তলানিতে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একের পর এক সুবিধা ও নির্দেশনা থাকলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ ২ জুলাই প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ আগস্টের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফরাহ মো. নাছের কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে শুরুতে তেমন গতি ছিল না। কঠোর তদারকির কারণে এখন ঋণ বিতরণ বাড়তে শুরু করেছে। আশা করছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ করতে সক্ষম হবে ব্যাংকগুলো। 

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো যাতে তারল্য সংকটে না পড়ে সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সিআরআর দুই দফায় দেড় শতাংশ কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। বড় শিল্প  ও সেবা খাত এবং সিএসএমই খাতে ঘোষিত মোট ৫০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের অর্ধেক অর্থ জোগানে আলাদা দুটি পুনরর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। তারল্য ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুতর করতে এক বছর মেয়াদি বিশেষ রেপো চালু করা হয়েছে। কমানো হয়েছে রেপো রেটও। এত কিছুর পরও ব্যাংকগুলো প্রণোদনার ঋণ বিতরণে অনীহা দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো গ্রাহক-কাস্টমার সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ করে থাকে। কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে কিছু ঋণ বিতরণ করেছে। তবে শুনেছি সিএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের এই ঋণ পেতে সমস্যা হচ্ছে। এই ঋণ পেতে ব্যাংকগুলোর সহযোগিতা করা উচিত।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, করোনার ক্ষতি কটিয়ে উঠতে প্রণোদনা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো যে প্রক্রিয়ার কথা বলছে তা পরিপালন করে ঋণ নেওয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব নয়। আসলে ঋণ না দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলো জটিলতা বাড়াচ্ছে।

এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে গত ১ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করা হয়েছে।

এরপর গত ২৭ জুন জাতীয় বাজেট নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম কিছু কিছু ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

করোনার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়। এ তহবিল থেকেই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে এ তহবিল থেকে এপ্রিল ও মে মাসে এক হাজার ৯৯২টি প্রতিষ্ঠানকে চার হাজার ৮২১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।

বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এ প্যাকেজ থেকে গত ৯ জুলাই পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য গঠন করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল। গত ২ জুলাই পর্যন্ত এই তহবিলের মাত্র ২০০ কোটি টাকা বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকগুলো।

কৃষকদের জন্য গঠন করা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার পুনরর্থায়ন তহবিল। এই তহবিলের ঋণ বিতরণেও কোনো গতি নেই।

রপ্তানিকারকদের প্রি-শিপমেন্ট ঋণ দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে তিন হাজার কোটি টাকার তহবিল রয়েছে। এই দুটি তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ শুরু হয়নি।

মন্তব্য