kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

ভিআইপিদের সঙ্গে ছবি ছিল প্রতারণার অস্ত্র

আবদুল্লাহ আল মামুন ও এস এম আজাদ   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভিআইপিদের সঙ্গে ছবি ছিল প্রতারণার অস্ত্র

দেশের বরেণ্য ব্যক্তি, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা, সরকারের মন্ত্রী, শীর্ষ আমলা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব—এমন বিশিষ্ট কেউ বাদ নেই যাঁর সঙ্গে বহুরূপী প্রতারক মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম ছবি তোলেননি। রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালানোর পর তাঁর মুখোশ উন্মোচিত হলে সেই সব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ছাড়াও বিএনপি নেতাদের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর অনেক ছবি। র‌্যাব-পুলিশের তদন্তকারীরা বলছেন,  গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে সেটি প্রকাশ করাই ছিল সাহেদের কৌশল। এসব ছবি প্রদর্শন করে সাহেদ অধীনদের কাছে জাহির করতেন তিনি অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি। আর এসব ছবি ব্যবহার করেই সাহেদ বিভিন্ন জায়গায় তদবির করতে দোর্দণ্ড প্রতাপ খাটাতেন। প্রতারণা করে উদ্দেশ্য হাসিল করতেন। প্রতারক সাহেদ ফটোশপের মাধ্যমেও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে নিজের ছবি লাগিয়ে দিয়েছেন বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। সাহেদ কাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগ।

এদিকে সাহেদকে গ্রেপ্তারে সব ধরনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাহেদের বাবা সিরাজুল করিম মারা গেছেন। মৃত্যুর খবর সাহেদের স্ত্রীকে জানানোর পর আত্মীয় পরিচয়ে দুই ব্যক্তি হাসপাতাল থেকে তাঁর লাশ নিয়ে গেছেন বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে সাহেদের এখনো হদিস মেলেনি। বাবার মৃত্যুর পরও ধরা দেননি তিনি।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ধানমণ্ডির বাসভবনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তাঁর সংসদ সদস্যকে ছাড় দেননি, তাঁর দলীয় নেতাদেরও তিনি ছাড় দিচ্ছেন না। যার (সাহেদ) কথা বলেছেন, যদি প্রমাণিত হয়, তাকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘তাকে ধরার জন্য অনুসন্ধান চলছে। র‌্যাব ও পুলিশ উভয়েই খুঁজছে। আমরা মনে করি, খুব শিগগির আমরা তথ্য দিতে পারব।’

গত ৭ জুলাই উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের সময় সাহেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই তা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি ফোন দিয়ে তার হাসপাতালে রোগী ভর্তি করি, সেই সুবাদে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, হাসপাতাল সিল করে দিচ্ছে। আমি বলেছি, আপনি নিশ্চয়ই কোনো অন্যায় কাজ করেছেন, এ জন্য সিল করছে। বিনা কারণে তো সিল করে না।’

র‌্যাবের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন,  ক্ষমতাসীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলা ছিল সাহেদের নেশা। সহযোগী তারেককে জিজ্ঞাসাবাদেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সাহেদের ছবি তোলার জন্য তাঁর সহযোগী থাকতেন। সাহেদ বিশিষ্ট ব্যক্তির পাশে গিয়ে দাঁড়ালে তাঁর সহযোগীরা তাত্ক্ষণিক ছবি তুলে ফেলতেন।

কোনো বিভাগের কাজ করতে গেলে বা তদবিরে গেলে সেখানকার অধীনদের শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে সাহেদের ছবি দেখিয়ে ভয় দেখাতেন। এভাবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ছবি দেখেও অনেকে তাঁকে আওয়ামী লীগের নেতা  ভেবেছিলেন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাহেদকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। পাশাপাশি মামলাটির তদন্তভার গ্রহণের জন্য আমরা আবেদন করেছি। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।’

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন,  গতকাল মহানগর হাকিম আদালতের নির্দেশে সাহেদের সহযোগী ও জনসংযোগ কর্মকর্তা  তারেক শিবলীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে আসা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত ৭ জুলাই অভিযানের দিন সাহেদ উত্তরায় অবস্থান করছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও বিশিষ্ট অনেক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে তদবির চালান। ব্যর্থ হয়ে মিডিয়া এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছে যান।  তাঁদেরও দুই-একজন সাহেদের পক্ষে তদবির করার চেষ্টা করেন। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে আত্মগোপনে চলে যান সাহেদ।

সাহেদের হয়রানি ও প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী নতুন করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে সিলেটের একজন পাথর ব্যবসায়ী, টাঙ্গাইলের একজন ঠিকাদার, মিরপুর ও উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতাল ভবনের মালিকরা রয়েছেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার পর সাহেদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামছে  দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। 

সাহেদ তাঁর স্ত্রী সাদিয়া আরবির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে টাকা পাচার করেছেন বলেও তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এ কারণেই স্ত্রী ভোল পাল্টে স্বামীর বিচার চাইছেন এবং কৌশলে বিভিন্ন কথা বলছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাহেদের স্ত্রীকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সাহেদের স্ত্রী সাদিয়া আরবি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওনার আর্থিক বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। আমি শুধু জানি আগে মামলা ছিল, মাঝে অনেক ভালো হয়ে গেছেন, এখন আবার এসব বের হলো। যেদিন অভিযান হয়েছে সেদিন রাতে তিনি ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন যেখানে আছেন নিরাপদে আছেন।’

সাহেদ কাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগ

করোনাভাইরাস পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ডেকে সাহেদের বিষয়ে জানতে চান বলে জানা গেছে। বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সাহেদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার সংবাদ আসায় বিব্রত দলটির কেন্দ্রীয় নেতারাও। তবে যাঁরা এত দিন সাহেদকে সহযোগিতা করে এসেছেন, তাঁরা এখন বিতর্কিত এই ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করছেন। আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে আমাদের দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে মোহাম্মদ সাহেদ আন্তর্জাতিক উপকমিটিতে এখন নেই। তিনি আগের কমিটিতে ছিলেন।’ এমন একজন বিতর্কিত ও প্রতারক কিভাবে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের আন্তর্জাতিক উপকমিটিতে প্রবেশ করল?—এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই মন্ত্রী আরো বলেন, ‘তিনি যে প্রতারক তা তো আগে জানা যায়নি। বিষয়গুলো এখন আমরা জানতে পারছি।’ ফারুক খান বলেন, ‘সব সময় আমাদের অবস্থান অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তাই সাহেদ যদি কোনোভাবে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকেন প্রমাণিত হয় তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। আওয়ামী লীগের কোনো নির্বাহী পদে তিনি কখনোই ছিলেন না।’ তাহলে মোহাম্মদ সাহেদ কিভাবে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকেন?—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজ (শুক্রবার) আমি আবার খোঁজ নিয়ে দেখেছি তার নামে কখনো কোনো চিঠি ইস্যু হয়নি। আর মিটিংয়ে ৫০-৬০ জন উপস্থিত থাকেন। কারো সঙ্গে হয়তো এসে থাকতে পারে। প্রতারক, ধোঁকাবাজ, মানুষ নামের কলঙ্ক, যাদের কোনো রাজনৈতিক ঐতিহ্য-ইতিহাস নেই, মানুষের জীবন নিয়ে যারা এমন ছিনিমিনি খেলে, হুমকির মুখে ফেলে দেয়, তাদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে এই ধরনের সাহেদদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আমাদের সরকার সেটাই করছে।’

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রতারক মোহাম্মদ সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির (২০১৬-২০১৯) উপকমিটিতে ২৪ নম্বর সদস্য ছিলেন। তিনি আগের কমিটির প্রায় সব বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন। ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর এখন পর্যন্ত নতুন উপকমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুরনো কমিটিতে যাঁরা ছিলেন তাঁদের নিয়েই একাধিক বৈঠক হয়েছে।

আওয়ামী লীগ না করেও মোহাম্মদ সাহেদ কিভাবে সরাসরি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন?—এ প্রশ্নের উত্তরে ওই উপকমিটির চেয়ারম্যান অ্যাম্বাসাডর মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘সাহেদ বর্তমান কমিটির কোনো পদে নেই। গত কমিটিতে সে সদস্য ছিল। আর এখনো নতুন কমিটি অনুমোদন হয়নি।’ তা সত্ত্বেও সাহেদকে বৈঠকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘মিটিংয়ে ৩০-৪০ জন উপস্থিত থাকে, অন্য সদস্যদের মতো আমি তাকেও চিনি।’

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও উপকমিটির সদস্যসচিব শাম্মী আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাহেদ আমাদের কমিটির সদস্য নয়। তার নামে কখনোই কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি।’ তাহলে নিয়মিত বৈঠকে আসতেন কী করে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তাকে কখনোই আমন্ত্রণ করিনি। তবে কারো সঙ্গে এলে তো আর ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া যায় না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা