kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

বান্দরবানের বাঘমারা হত্যাকাণ্ড

প্রবল হলো আরো হামলার শঙ্কা

মনু ইসলাম, বান্দরবান    

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



প্রবল হলো আরো হামলার শঙ্কা

‘ভোরে মানুষটি বাড়ির আঙ্গিনায় চেয়ার পেতে বসে বাঘের মতো গর্জন করছিলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিনি চেয়ারে বসা অবস্থায়ই নিস্তেজ মূর্তি হয়ে গেলেন। কত ঠুনকো এ জীবন!’

বান্দরবানের বাঘমারায় গত মঙ্গলবার ভোরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক বৃদ্ধ। তিনি ওই গ্রামেরই বাসিন্দা। তবে প্রাণভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি।

‘রাশভারী বিধু বাবুও পড়ে ছিলেন উপুড় হয়ে মাটিতে। তাঁর এক পায়ে স্যান্ডেল পরা ছিল। আরেক পায়েরটি উড়ে গিয়েছিল অনেক দূরে। কেউ পড়ে আছেন হাঁটু গেড়ে। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা কারো মাথার চারপাশে ছোপ ছোপ রক্ত। কী ভয়াবহ দৃশ্য!’

বলছিলেন পাড়ার আরেক নারী। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে পালিয়ে গেলেও সেনা সদস্যরা পাড়ায় চলে আসার পর ফিরে এসে তিনি যে দৃশ্য দেখছিলেন তারই বর্ণনা দিচ্ছিলেন চুপিসারে। বললেন, ‘আর বোধহয় এই পাড়ায় থাকা যাবে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা, বাজারের ব্যবসায়ী ও আশপাশের রাজনীতি সচেতন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত মঙ্গলবার ভোরে কিছু বাজার-সদাই সেরে বাজার লাগোয়া বাড়িতে ঢুকে যান রতন তঞ্চঙ্গ্যা। সহযোদ্ধাদের সকালের নাশতার আয়োজন রয়েছে তাঁর বাড়িতে। এ জন্য তাঁর পিছু পিছু আসেন আরো সাতজন।

ধারণা করা হচ্ছে, বাজার ও রতনের বাড়ির আশপাশেই ছিল হামলাকারীরা। রতনসহ সবাই বাড়ির উঠানে আসন পেতে বসার পর চারদিক থেকে ঢুকে পড়ে সাতজন। তাদের হাতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। টার্গেট লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে বাধাহীনভাবে চলে যায় তারা। উঠান আর ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে ছয়টি লাশ। আহত দুজনের গোঙানি আর পাশের বাড়ির গুলিবিদ্ধ নিরপরাধ অরাজনৈতিক নারীটিও তখন চিৎকার করছিলেন। হত্যাকারীরা চলে যাওয়ার পর কেউ কেউ ভয়ে ভয়ে বাড়ির ভেতর ঢোকে। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে আসেন কাছাকাছি থাকা সেনা ক্যাম্পের সৈনিকরাও। কিছুক্ষণ পর সেখানে পুলিশ পৌঁছে।

এ হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংস্কারবাদী বা এম এন লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি প্রজীব চাকমা, বান্দরবান জেলা শাখার সমন্বয়ক রতন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাসহ আরো চারজন। জানা গেছে, তাঁরাও কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। হতাহতদের মধ্যে রতন তঞ্চঙ্গ্যা এবং পাশের বাড়ির নারী ছাড়া সবাই খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার বাসিন্দা। পার্টি গোছানোর কাজে তাঁরা বাঘমারায় অবস্থান করছিলেন। এখানে একটি অফিস নিয়ে সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি রাতেও ঘুমাতেন তাঁরা দ্বিতল এই বাড়িতে।

এম এন লারমা গ্রুপের বান্দরবান শাখার সেকেন্ডম্যান হিসেবে পরিচিত উবা মং বলেন, ‘এলাকায় আমাদের জনসমর্থন দেখে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে জনসংহতি সমিতি সন্তু গ্রুপ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’ এই গ্রুপের আরেক সদস্য বলেন, ‘সন্তুর চ্যালারা এ অঞ্চলে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও খুন করে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। আমরা তাদের এখান থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছি। আর এটাই আমাদের অপরাধ।’

কয়েক বছর ধরে সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে বান্দরবান সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়ন, কুহলং ইউনিয়ন, রাবার বাগান এলাকা এবং রোয়াংছড়ি উপজেলার নোয়াপতং ইউনিয়ন, সদর ইউনিয়ন ও তারাছা ইউনিয়নের ৪০টির বেশি গ্রামের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা ভয়াল জনপদে পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা