kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

‘অবৈধ’ হাসপাতাল চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর!

তৌফিক মারুফ   

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘অবৈধ’ হাসপাতাল চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর!

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড ও কলেজগেট এলাকায় দুটি ভবনে রয়েছে কেয়ার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। দুটি হাসপাতালের অবস্থান মিরপুর সড়কের পাশে। একই সড়ক ধরে মিরপুরের দিকে যেতে থাকলে শ্যামলী ও কল্যাণপুরের মাঝামাঝি জায়গায় পড়ে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল। কেয়ার হাসপাতালটি পুরনো হলেও নতুন সুরম্য ভবনে পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালটি। নতুন চালু হলেও এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে স্বাস্থ্যসেবার এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথি বলছে, ওই দুটি বড় বেসরকারি হাসপাতালের একটিরও নিবন্ধন হালনাগাদ করা নেই। অর্থাৎ নিবন্ধন নবায়ন করা হয়নি চলতি বছরে।

জানতে চাইলে কেয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গাইনি ও বন্ধ্যত্ব বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক পারভিন ফাতেমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়ন করতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাগে। টাকার সমস্যার কারণে নবায়ন করা হয়নি, শিগগিরই করার চেষ্টা করব।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আল ইমরান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিবন্ধন নবায়নের কাগজপত্র ও টাকা জমা দিয়েছি। কিন্তু করোনার ব্যস্ততার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিবন্ধন নবায়নকাজ বন্ধ রেখেছে।’

শুধু এমন দু-একটিই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় মোট ১৭ হাজার ২৪৪টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন সময়ে নিবন্ধন নিয়েছে। বিভাগ হিসাবে ঢাকায় পাঁচ হাজার ৪৩৬টি, চট্টগ্রামে তিন হাজার ৩৭৫টি, রাজশাহীতে দুই হাজার ৩৮০টি, খুলনায় দুই হাজার ১৫০টি, রংপুরে এক হাজার ২৩৬টি, বরিশালে ৯৫৭টি, ময়মনসিংহে ৮৭০টি এবং সিলেটে ৮৩৯টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অর্ধেকের বেশির নিবন্ধন নবায়ন করা নেই। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেই রিজেন্ট হাসপাতালের মতো কাহিনি বেরিয়ে এসেছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই বিভিন্ন সূত্র।

উল্লেখ্য, প্রতি অর্থবছর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নবায়ন করা বাধ্যতামূলক।

ওই সব সূত্র বলছে, হাসপাতাল শাখা নিবন্ধন না করা শত শত হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সঙ্গে বিশেষ সমঝোতা করে বছরের পর বছর তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে। আর যখন কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটে তখন নিজেদের দায় এড়ানোর সুযোগ নিতে ওই নবায়ন না থাকার কথা প্রকাশ করে বা হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দেয়। এর আগেও কয়েকটি হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু, ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে রোগীর অপারেশনের মতো ঘটনা র‌্যাবের অভিযানে উঠে আসার পর নিবন্ধন না থাকার কথা জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এটাকে ভূতুড়ে কাণ্ড বলে মনে করেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।

রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় নমুনা পরীক্ষা না করেই করোনার ফলাফল দিয়ে এবং পরীক্ষার জন্য বেশি টাকা নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। ২০১৪ সাল থেকেই রিজেন্টের নিবন্ধন নবায়ন করা হয়নি। অথচ করোনা চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবৈধ হয়ে যাওয়া এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে গত সোম ও মঙ্গলবার র‌্যাব রিজেন্টের এ দুটি শাখায় অভিযান চালায় এবং সিলগালা করে দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্পেশালাইজড হাসপাতালেও করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয়, পরীক্ষাও করা হয়। পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয় সাড়ে চার হাজার টাকা করে। জানা গেছে, শুরুর দিকে ওই হাসপাতালে সংগ্রহ করা নমুনা সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) এবং ঢাকা শিশু হাসপাতাল থেকে বিনা মূল্যে পরীক্ষা করানো হলেও রোগীদের কাছ থেকে পুরো ফি নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে হাসপাতালটির সিইও বলেন, ‘আমরা রোগীদের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য একটা রেজিস্ট্রেশন ফি নিই, এক হাজার টাকা। এর বাইরে আগে টাকা নেওয়া হতো না। এখন একটি প্রাইভেট ল্যাব থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়, তাই সরকার নির্ধারিত ফি ও সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়।’

নবায়ন না থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনার কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নবায়ন ছাড়া হাসপাতালের সংখ্যা অনেক। আমরা নিয়মিত বহু হাসপাতালকে নোটিশ করে যাচ্ছি। এই প্রক্রিয়া চলমান আছে।’ নিবন্ধন নবায়ন না করে কতটি হাসপাতাল চালানো হচ্ছে, তার সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি তিনি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, শুধু রিজেন্টেই শেষ নয়, আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড থাকা আর কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন সমস্যা নেই বলে তিনি দাবি করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেক সূত্র জানায়, রিজেন্ট হাসপাতালের ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে, যার জের ধরে গতকাল এক জরুরি বৈঠকে বসেন হাসপাতাল শাখার কর্মকর্তারা। তাঁরা একটি তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং সেই সঙ্গে নিজেদের রক্ষার পথ খুঁজছেন বলেও ওই সূত্র জানায়।

অধিদপ্তরের অন্য একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের পর থেকেই বেশির ভাগ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নবায়ন ঝুলে পড়ে। ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক পরিপত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন ফি ও নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার ও সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবায়ন ফি করা হয় আড়াই লাখ টাকা। অন্যদিকে বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন এলাকার ভেতরে থাকা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নবায়ন ফি ১০-৫০ শয্যার জন্য ৫০ হাজার টাকা, ৫১-১০০ শয্যার জন্য এক লাখ, ১০০-১৪৯ শয্যার ক্ষেত্রে দেড় লাখ, আড়াই শ শয্যার জন্য দুই লাখ টাকা করা হয়। একই শয্যাসংখ্যার জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের জন্য যথাক্রমে ৪০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার, এক লাখ ও দেড় লাখ এবং উপজেলা পর্যায়ের জন্য যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও এক লাখ টাকা করা হয়। এর পর থেকেই বেঁকে বসে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো।

নিবন্ধন নবায়নের ক্ষেত্রে ফি বৃদ্ধিসহ তিনটি বড় কারণের অজুহাত দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথমত এই সাড়ে ১৭ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে বেশির ভাগই ছোট। অনেক হাসপাতালই আছে তারা সব খরচ মিটিয়ে আয় করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে উপজেলা বা জেলা এমনকি ঢাকারও অনেক ছোট হাসপাতাল বা ক্লিনিকের পক্ষেই নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকার জায়গায় ৫০ হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন নিবন্ধন ও নবায়ন করতে হয় অনলাইনে। এ ক্ষেত্রে শয্যা অনুসারে চিকিৎসক  ও নার্সের পর্যাপ্ত সংখ্যা এবং তাঁদের বিস্তারিত নির্দিষ্ট ফরমেটে পূরণ করে দিতে হয়। ওই ফরমেট পূরণ না করলে সফটওয়্যার তা নেয় না। অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে শয্যা অনুসারে পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় কিংবা এমন আরো কিছু কারিগরি ঘাটতির কারণে অনেকেই ওই ফরমেট পূরণ করতে পারে না। সে জন্য নিবন্ধনও নবায়ন করতে পারছে না।

ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী তৃতীয় কারণটি হলো, আবাসিক এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক না রাখার নির্দেশনাও নবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবাসিক এলাকায় থেকে যাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। নবায়ন করতে গেলেই ঠিকানার জায়গায় গিয়ে অনেকে আটকে যাচ্ছে। ফলে তারাও নবায়ন এড়িয়ে যাচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা