kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

পাপুল কুয়েতের নাগরিক হলে এমপি পদ হারাবে

রিজেন্টের দুর্নীতিও সরকারের পক্ষ থেকেই ধরেছি ♦ ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে একটি বই প্রকাশ পাচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পাপুল কুয়েতের নাগরিক হলে এমপি পদ হারাবে

মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তারকৃত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, এমপি পাপুলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশেও তদন্ত চলছে। দুর্নীতি ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার।

ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারে না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আরো বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওই সময়কার দিনলিপির তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতো ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে কুয়েতে গ্রেপ্তারকৃত এমপি পাপুলের বিষয়ে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশিদের প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যে সংসদ সদস্যের কথা বলা হয়েছে, সে কিন্তু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। সে কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নমিনেশন চেয়েছিল, আমি কিন্তু দিইনি। সে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। গত নির্বাচনে ওই আসনটি জাতীয় পার্টিকে দিয়েছিলাম। জাতীয় পার্টির নোমান (প্রার্থী) নমিনেশন পেয়েছিল, কিন্তু সে নির্বাচন করেনি। এ কারণে ওই লোক (এমপি পাপুল) জিতে আসে। এরপর আবার তাঁর স্ত্রীকেও যেভাবে হোক বানায় (সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য)। কাজেই তাকে এমপি আমাদের বানানো নয়।’

সংসদ নেতা বলেন, ‘এখানে প্রশ্ন উঠেছে ওই সংসদ সদস্য (পাপুল) নাকি কুয়েতের নাগরিক। সে কুয়েতের নাগরিক কি না সেটা নিয়ে কুয়েতের সঙ্গে কথা বলছি, বিষয়টা দেখব। যদি এটা হয় তাহলে তাঁর ওই আসনটি (লক্ষ্মীপুর-২) খালি করে দিতে হবে। যেটা আইন আছে, সেটাই হবে। আর তার বিরুদ্ধে এখানেও তদন্ত চলছে।’

রিজেন্টের দুর্নীতিও সরকারের পক্ষ থেকেই ধরেছি

রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালের অপকর্মসহ স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মের অভিযোগ করে বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদ বলেন, ‘কভিড টেস্টের অনুমতি দলীয় বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি করতে। রিজেন্ট হাসপাতালের যে পরিচালনা বোর্ড রয়েছে, তাদের অগোচরেই কি এসব অপকর্ম হয়েছে? মানুষের জীবন-মরণের সংকটময় মুহূর্তে সরকারের জায়গা থেকে র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট নই, এই রকম ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত নয়। তাদের ক্রসফায়ারে দেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটাও (রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি) কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেই ধরেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনিয়মগুলো খুঁজে বের করেছি। এরই মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ওই (রিজেন্ট) হাসপাতালের এই তথ্য কিন্তু আগে কেউ দেয়নি, জানাতে পারেনি, অন্য কেউ জানায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেই খুঁজে বের করেছি, ব্যবস্থা নিয়েছি। র‌্যাব সেখানে গেছে। সেখান থেকে জড়িতদের খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

করোনাকালে সঠিক ব্যক্তির কাছে সহায়তার টাকা পৌঁছে দিচ্ছি

করোনাকালে ত্রাণ সহায়তার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘সারা দেশে ৫০ লাখ পরিবারকে আমরা সহায়তা দিচ্ছি। তাদের তালিকা বানানো হয়েছে। সেই তালিকা তিন দফা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের আইডি কার্ড, ভোটার লিস্টে নাম—সব কিছু মিলিয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। সব কিছু যাচাই করে সঠিক ব্যক্তির কাছে টাকাটা পৌঁছে দিচ্ছি। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের সময়ও লেগেছে। অন্য যে নামধাম (ভুয়া/অযোগ্য) এসেছে, তা বাদ দেওয়া হয়েছে।’

কাজ হারানো প্রবাসীদের জন্য কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে কর্মহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশি কর্মীরা যাতে করোনা-পরবর্তী সময়ে পুনরায় কাজে নিয়োগ পেতে পারে সে জন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে আমরা দুস্থ ও কর্মহীন হয়ে পড়া প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে প্রায় ১১ কোটি টাকার ওষুধ, ত্রাণ ও জরুরি সামগ্রী বিতরণ করেছি।’

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাবিবর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সংকট নিরসনে সরকার বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশি শ্রমিক ও অভিবাসীদের অধিকার সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তাদের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত ও অন্তত ছয় মাস চাকরিচ্যুত না করতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ করেছি। অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার অনুরোধ করা হয়েছে।’

লকডাউন দীর্ঘকাল থাকলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে

সরকারি দলের আরেক সদস্য আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা বিস্তার রোধে লকডাউন কার্যকর কৌশল হলেও এই পরিস্থিতি দীর্ঘকাল অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিতে কর্মহীনতা ও দরিদ্রতা লাগামহীন হারে বেড়ে অন্যান্য কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা নামে আরেকটি বই প্রকাশ করা হচ্ছে

জাতীয় পার্টির এমপি মুজিবুল হক চুন্নুর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ কিভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশ করেছিলেন, সেই তথ্য তুলে ধরেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, “‘কারাগারের রোজনামচা’ মূলত ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত। একাত্তর সাল থেকে আমরা উনার কোনো লেখা পাইনি। কারণ একাত্তর সালে উনি কারাগারে (পাকিস্তানে) কিভাবে ছিলেন, কী অবস্থায় ছিলেন, আসলে তার কিছু আমরা জানি না।”

তিনি বলেন, “সামান্য একটা লাইন পাওয়া গেছে, আইয়ুব খানের ডায়েরি, অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত। সেখানে উনার (বঙ্গবন্ধু) সম্পর্কে কিছু কমেন্ট করা আছে। ‘বঙ্গবন্ধুকে যখন কোর্টে নিয়ে আসা হতো, উনি আসতেন, দাঁড়াতেন, বসতে বললে বসতেন। উনি এসে দাঁড়িয়েই নাকি জয় বাংলাদেশ বলতেন। বলতেন, আমাকে যা খুশি তাই করো, আমার যেটা করার আমি তা করে ফেলেছি। অর্থাৎ আমার বাংলাদেশ তো স্বাধীন হবেই।’ এর বাইরে একাত্তরের কিছু আমি পাইনি। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখনো আমার চেষ্টা আছে ওখান (পাকিস্তান) থেকে কোনো কিছু উদ্ধার করা যায় কি না?”

তিনি বলেন, ‘১৯৬৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ক্লাসিফায়েড রেকর্ড সংগ্রহ করেছি, যেখানে বাংলাদেশের বিষয়টি রয়েছে। সাউথ এশিয়ার কিছু বিষয় আছে, অনেক কাগজ, বিশাল। এগুলো আমার অফিসে ছিল। করোনাভাইরাসের কারণে একটা সুবিধা হয়েছে। ঘরে থাকার কারণে সেগুলো সব ধীরে ধীরে দেখছি। সেখানে ওই সময়কার কিছু পাওয়া যায় কি না সেই চেষ্টা করছি।’

এ সময় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতো ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ একটা লেখা আছে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতোই উনার জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে কিছু লেখা। সেই লেখাগুলো আমি প্রস্তুত করেছি। তা প্রায় তৈরি হয়ে আছে। ওটা আমরা ছাপতে দেব। আমার ধারণা, এটা ছিল একটি রাফ কাজ। প্রথমে তিনি ওটা করেন। তারপর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রস্তুত করেন ছাপানোর জন্য।”

জাতির জনক তাঁর জীবদ্দশায় সন্তানদের বা পরিবারের সদস্যদের কাছে কখনো জেলজীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতেন না বলে শেখ হাসিনা সংসদকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “তিনি (বঙ্গবন্ধু) কিন্তু কখনো তাঁর কারাজীবনের কোনো কষ্ট, দুঃখ-যন্ত্রণা কিছুই বলেননি। যেটুকু আমরা জানি এই বই পড়ে। তাঁর লেখা পড়ে আমরা এটা জেনেছি। এর বাইরে আমরা কিছু জানতে পারিনি। কোনো দিন তিনি মুখ ফুটে বলতেন না যে উনার কষ্ট ছিল। কখনো বলেননি। আমি রেহানাকে জিজ্ঞাসা করেছি। ও ছোট ছিল তো, ও মাঝেমধ্যে আব্বাকে এ সমস্ত জিজ্ঞাসা করত, যা আমরা সাহস পেতাম না। আমি কয়েক দিন আগেও জিজ্ঞাসা করেছি ‘তুই কি কিছুই শুনিস নাই?’ জবাবে বলল, ‘আব্বাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বলেছিলেন, ‘তোর শোনা লাগবে না। শুনলে সহ্য করতে পারবি না।’ উনার কথা ছিল, ‘শোনার দরকার নেই। আমি বলব না। তোরা সহ্য করতে পারবি না।’”

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এত কষ্ট একজন মানুষ একটা দেশের জন্য, জাতির জন্য করতে পারেন তা ধারণার বাইরে। তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন সংগঠন করার জন্য, আওয়ামী লীগ করার জন্য। দেশের মানুষের জন্য তিনি সব কিছুই ছেড়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলেই প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। ক্ষমতায় যেতে পারতেন। কিন্তু উনার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা