kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

বান্দরবানে পাহাড়ি ছয় নেতাকে হত্যা

জনসংহতির সন্তু গ্রুপকে দায়ী করছে এম এন লারমা গ্রুপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি   

৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




বান্দরবানে পাহাড়ি ছয় নেতাকে হত্যা

বান্দরবানের রাজবিলায় ভোরের আলোয় অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে গ্রামে ঢুকে পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক সংগঠনের ছয় নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায়  আহত হয়েছেন আরো চারজন। হতাহতরা সবাই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) এম এন লারমা গ্রুপের সদস্য। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে বান্দরবান সদর উপজেলা, রোয়াংছড়ি ও রাঙামাটির রাজস্থলীর সীমান্তবর্তী গ্রাম বাঘমারা বাজার পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে দুজনকে সংকটাপন্ন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার জেরিন আকতার এবং বান্দরবান সদর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো মামলা হয়নি।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন পিসিজেএসএস এম এন লারমা গ্রুপের বান্দরবান শাখার সভাপতি রতন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, সহসভাপতি প্রজীব চাকমা, ডেবিড বাবু, মিলন চাকমা, জয় ত্রিপুরা ও দীপেন ত্রিপুরা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত দুজন হলেন বিদ্যুৎ চাকমা ও নীরু চাকমা। অন্যদের পদবি জানা যায়নি। এ ঘটনার পর আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল অধ্যুষিত বাঘমারাপাড়া, মনজয় পাড়া, রোয়াংছড়ির সোনাইছিপ্রুপাড়া, জামছড়িপাড়া, নাচালংপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে ব্যাপারে পুলিশ এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পায়নি। তবে এম এন লারমা গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক উবা মং দাবি করেছেন, জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপই ঘটনাটি ঘটিয়েছে।

তিনি জানান, ভোরে সংগঠনের সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাসায় নাশতা খাওয়ার জন্য সবাই তাঁর বাড়িতে একত্র হয়েছিল। এ সময় ছয়-সাতজনের একটি দল এসে তাঁদের ওপর গুলি চালায়। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সদর থানার ওসি জানান, জননিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী এবং বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে জামছড়িতে থাকা পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পকে বাঘমারায় স্থানান্তর করা হয়েছে। রাতে পুলিশের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে।

এদিকে স্থানীয়ভাবে লাশ শনাক্ত এবং সুরতহাল প্রতিবেদনের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে।

বাঘমারা বাজার পাড়ায় হত্যার ব্যাপারে স্থানীয়দের কেউ তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে পাড়ার একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হামলাকারীরা ছয় থেকে সাতজন ছিল বলে তিনি শুনেছেন। তবে ঘটনার পর অস্ত্র হাতে দুজনকে তিনি চলে যেতে দেখেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নোয়াপতং ইউনিয়নের একজন সাবেক ইউপি সদস্য বলেন, এর আগে চাঁদাবাজি এবং এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও দিনের আলোতে অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে গ্রামে ঢুকে বেছে বেছে ছয়জনকে হত্যার ঘটনা এটাই প্রথম। তিনি আশঙ্কা করছেন, এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে আরো পাল্টা সহিংসতা হতে পারে।

পাড়ার বাসিন্দারা জানান, ঘটনার পরপরই পাশের ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বান্দরবান সদর থেকে পুলিশ এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়। তবে এর আগেই সন্ত্রাসীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

নিহতদের মধ্যে রতন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা তৎকালীন শান্তিবাহিনীর একজন দুর্ধর্ষ গেরিলা ছিলেন। অস্ত্র সমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পর জনসংহতি সমিতির রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরে জনসংহতি সমিতি বিভক্ত হয়ে পড়লে তিনি সংস্কার গ্রুপে যোগ দেন। এর পর থেকে এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর সঙ্গে সন্তু গ্রুপের শত্রুতা শুরু হয়। সম্প্রতি বাঘমারা এলাকায় কর্তৃত্ব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে সন্তু গ্রুপের ক্যাডাররা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত হিসেবে গতকালের খুনের ঘটনাটি ঘটল।

খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ : বান্দরবানে সন্ত্রাসী হামলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির এম এন লারমা গ্রুপের ছয় নেতাকে হত্যার প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ করেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। গতকাল বিকেলে মহাজনপাড়া থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে।

পরে মুক্তমঞ্চের সামনে জনসংহতি সমিতির জেলা সহসভাপতি সুভাষ কান্তি চাকমার সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন জনসংহতি সমিতির জেলা সাধারণ সম্পাদক সিন্ধু কুমার চাকমা, দীপন চাকমা, প্রত্যয় চাকমা, জকি চাকমা, জিনিত চাকমা প্রমুখ।

সমাবেশ থেকে হামলার ঘটনায় সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করে নিন্দা জানানো হয়। অবিলম্বে তাঁরা হামলার ঘটনার বিচার দাবি করেন। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা