kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

করোনার চিকিৎসার নামে ভয়ংকর প্রতারণা

রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় হাসপাতাল সিলগালা

► চেয়ারম্যানসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
► অনুমোদনহীন কিট গাড়ি জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় হাসপাতাল সিলগালা

টেস্ট না করে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াসহ গুরুতর নানা অভিযোগে গতকাল রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনা রোগীদের চিকিৎসার নামে সরকার ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছিল রিজেন্ট গ্রুপ। রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরে তাদের দুটি হাসপাতালে যাওয়া রোগীর স্বজনদের সেবা ও ব্যয় সম্পর্কে কোনো ধারণাই দিত না তারা। নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই দেওয়া হতো করোনার রিপোর্ট, সেবায় ছিল ভয়াবহ অবহেলা। অথচ আদায় করা হতো লাখ লাখ টাকা। যদিও বিনা মূল্যে করোনা পরীক্ষার অনুমতি নিয়েছিল তারা।

গতকাল মঙ্গলবার রোগী স্থানান্তরের পর উত্তরা ও মিরপুরের দুটি হাসপাতালই সিলগালা করে দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এদিন সিলগালা করা হয়েছে রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ও। গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আগের দিন সোমবার রাতে চালানো অভিযানে অননুমোদিত র‌্যাপিড টেস্টিং কিট ও সাহেদের গাড়ি জব্দ করা হয়। র‌্যাবের অভিযানে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কে অবস্থিত রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে বহু অপকর্মের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে।

মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সাধারণ এক রোগীর ১৪ দিনের বিল করা হয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। অক্সিমিটারে রোগীর শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ দেখেন স্বজনরাই। এর পরও এ জন্য ৭২ হাজার টাকা বিল করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডাক্তারের ফি ধরা হয় ৪৫ হাজার টাকা। ভুক্তভোগী এক স্বজন জানান, কোন সার্ভিসে কত টাকা তা জিজ্ঞেস করার পরও জানানো হয়নি তাঁদের। শুধু বলা হয়েছে, ভর্তি হন, টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না। পরে সাড়ে তিন লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, নানা ধরনের ১৪টি অভিযোগ পেয়ে র‌্যাব রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানে যায়। সেখানে দুই ডজনের মতো অনিয়ম ও অপরাধের আলামত পেয়েছে তারা। রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্স ছয় বছর আগে শেষ হলেও প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছিলেন সাহেদ। করোনার সময়ও মানুষকে হয়রানি করছিলেন তিনি। অভিযোগের পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের তথ্য উঠে আসছে।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরি রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখার কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান এ বিষয়ে জানান, রিজেন্ট হাসপাতাল স্বেচ্ছায় মার্চ মাস থেকে বিনা মূল্যে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য তাঁদের কাছ থেকে অনুমতি নেয়। কিন্তু পরে তারা নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে এবং রোগীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। একপর্যায়ে তাদের হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পর তা নবায়নের জন্য বলা হয়। তবে তারা তা আমলে নিচ্ছিল না। এর মধ্যেই র‌্যাবের অভিযানে আরো অনেক ধরনের অনিয়ম ও প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। ফলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা এবং বাড়িতে থাকা রোগীদের করোনার নমুনা সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট দিত রিজেন্ট হাসপাতাল। সরকার থেকে বিনা মূল্যে টেস্ট করার অনুমতি নিয়ে রিপোর্টপ্রতি সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে আদায় করত তারা। এভাবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে মোট তিন কোটি টাকা হাতিয়েছে রিজেন্ট। এসব অপরাধ ও টাকার নিয়ন্ত্রণ করতেন চেয়ারম্যান সাহেদ অফিসে বসে। এসব অপকর্ম রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় থেকেই হতো বিধায় এটি সিলগালা করা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের স্থানান্তর করে হাসপাতাল দুটিও সিলগালা করা হয়েছে।’

গাড়ি জব্দের ব্যাপারে সারোয়ার আলম বলেন, ওই গাড়িতে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের স্টিকার লাগানো ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনের চোখে ধুলো দিতেই ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্টিকার ব্যবহার করা হতো। এর আগে সোমবার রাতে অভিযানে রিজেন্টের আট কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। ২০১৪ সালের পর নবায়ন হয়নি উত্তরা শাখার লাইসেন্স। আর ২০১৭ সালের পর নবায়ন হয়নি মিরপুর শাখার অনুমোদন।

গতকাল অভিযান শেষে সারোয়ার আলম বলেন, রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় থেকেও অনুমোদনহীন টেস্ট কিট ও বেশ কিছু ভুয়া রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

অভিযানের সময় ভবনের মালিক জাহানারা কবির অভিযোগ করেন, চুক্তি শেষ হওয়ার পরও কার্যালয় দখলে রাখা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে।

র?্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মামলা করতে যাচ্ছি। এই মামলার এক নম্বর আসামি হবেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ। এখন পর্যন্ত র?্যাব চারজন আসামির সম্পৃক্ততা পেয়েছে।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, মামলায় ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, করোনা রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে, এই মর্মে সরকারের কাছে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার বেশি বিল জমা দিয়েছে রিজেন্ট। এ পর্যন্ত শ দুয়েক কভিড রোগীর চিকিৎসা দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। তারা আইইডিসিআর, আইটিএইচ ও নিপসম থেকে চার হাজার ২০০ রোগীর নমুনা বিনা মূল্যে পরীক্ষা করিয়ে এনেছে। অথচ রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছে। ভুত্তভোগীরা অভিযোগ তুললে সাহেদ নিজেই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে নিজের অপরাধ ঢাকতে চেয়েছেন।

রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া এক রোগী বলেন, ‘চিকিৎসাব্যবস্থা সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। আমার গলার চেইন, কানের গয়না বিক্রি করে এ পর্যন্ত এসেছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা