kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

ঘন ঘন নীতির পরিবর্তনে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে

► জমির মূল্যের সঙ্গে ১৫% ভ্যাট বসানোর সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
► ভ্যাট প্রত্যাহারে বেজার চিঠি, প্রত্যাহারে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ঘন ঘন নীতির পরিবর্তনে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে

দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে সরকারি দপ্তরে পদে পদে হয়রানি ও ভোগান্তির কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ কতটা নাজুক তার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে, যেখানে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের ক্ষেত্রে সরকারের ঘন ঘন নীতি-কৌশল পরিবর্তনকে বড় বাধা বলছেন ব্যবসায়ীরা। বারবার নীতি-কৌশল পরিবর্তন করলে ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে, বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। বিশ্বের যেকোনো দেশেই বিনিয়োগ টানার মূলমন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় দেশি বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট করা। দেশি বিনিয়োগকারীদের হাত ধরেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগে আশ্বস্ত হন। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো। সরকার দেশজুড়ে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে বেশ আগে। ১০ বছর কর রেয়াতসহ নানা সুবিধা দেওয়ায় সেসব অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়াও ফেলেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ঘন ঘন নীতি-কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমির লিজ ভাড়ার ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট চাপাতে যাচ্ছে সরকার। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহ হবেন মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজার) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এমনিতেই ব্যবসা করা কঠিন। তার ওপর করোনার কারণে দেশে ব্যবসায় মন্দা চলছে। সেখানে জমির ওপর বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করলে ব্যবসায়ীদের জন্য আরো কঠিন হয়ে যাবে। ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুরোধ করেছি। আশা করছি, এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে।’

এদিকে নতুন করে ভ্যাট আরোপ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করা দুই ডজনের বেশি ব্যবসায়ী গ্রুপ। নতুন করে ভ্যাট আরোপের পাশাপাশি বেশ কিছু নতুন জটিলতার কারণে ব্যাংকঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে গেছে। এ ছাড়া বিনিয়োগের ফলে বিনিয়োগকারীরা যে সুবিধা পেয়ে আসছেন তা-ও অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) পাঠানো এক চিঠিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। সরকারের নতুন নীতির কারণে কিভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ছে এবং লাখ লাখ চাকরি সৃষ্টির সম্ভাবনা নষ্ট হতে বসেছে, তারও উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে।

১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে কাজ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সংস্থাটি এরই মধ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব পেয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ঘন ঘন নীতি-কৌশল পরিবর্তনের কারণে তাঁরা আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন। ভ্যাট নিয়ে বেজার কাছ থেকে নতুন একটি চিঠি পাওয়ার পর তাঁদের মনোবল ভেঙে গেছে। বেজার কর্মকর্তারাও বলছেন, জমির মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত হলে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন, অন্যদিকে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে সরকারের শুল্ক ও ভ্যাট নীতি থেকে সরে আসা। এর ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাঁদের বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ল।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ টানতে হলে অবশ্যই নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবির প্রতি এফবিসিসিআইয়ের সমর্থন সব সময় রয়েছে।’

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ফলে যে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা পাওয়ার কথা, তা পাওয়ার জন্য আমরা প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করছি, যেখানে বিবেচনা করা হবে না কোন ধরনের পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।’ বেজা কর্তৃক প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব করা হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

২০১৮ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া নতুন ভ্যাট আইনে জমিকে উপকরণ বা ‘ইনপুট’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জমিকে ইনপুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে আগে পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে ভ্যাটের সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও নতুন বাজেটে সেই সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

অপ্রত্যাশিত ভ্যাটের বোঝা চাপল বিনিয়োগকারীদের ওপর : বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে লিজ ভাড়ার ওপর যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, এ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিনিয়োগের সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি; যদিও বাণিজ্যিক লিজের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রদানের একটি সাধারণ বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বেজা যে ভ্যাট দাবি করেছে, তা এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। তা সরকারের ‘ভ্যাট অন কমার্শিয়াল লিজিং’ এসআরওর আওতায় নয়।  বিনিয়োগকারীরা বলছেন, এসআরওতে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, ‘ভ্যাট নিবন্ধিত ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানের কারখানা বা প্লান্ট স্থাপনে লিজের ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় পড়বে।’ ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধিত ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনের জন্য ইজারাপ্রাপ্ত সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে। সরকারি সার্কুলার অনুযায়ী অব্যাহতি সুবিধা থাকায় এ ক্ষেত্রে তাদের ভ্যাট দিতে হয় না। তাই চিঠিতে অতিরিক্ত এ ভ্যাট দ্রুত তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সময় বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট বলা হয়েছে, যে ধরনের শিল্পই প্রতিষ্ঠা করা হোক না কেন, তাঁরা ১০ বছর পর্যন্ত করপোরেট আয়কর হলিডে ভোগ করবেন। ওই সময় বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে পণ্যই উৎপাদন করা হোক না কেন, সরকার যেন ঘোষিত সুবিধায় কোনো পরিবর্তন না ঘটায়। এ ছাড়া বিদ্যমান প্রণোদনার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সময়ে সময়ে যেন সরকার নতুন প্রণোদনা দেয়। এমন অনুরোধও করা হয়েছিল।

বেজা ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে ভূমি ইজারার যে চুক্তি হয়েছে তার ২৪ ধারা অনুযায়ী ভূমি মর্টগেজ বা বন্ধকের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। কিন্তু কোনো নিয়মের লঙ্ঘন ঘটালে কিংবা এ কারণে তৃতীয় পক্ষের কাছে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সে সুযোগ দেওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করবে বেজার মতামতের ওপর।

একই সঙ্গে ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) বেজার এনওসি (অনাপত্তি সনদ) ছাড়া ঋণ সুবিধা বাড়াতে আগ্রহী নয়। এ ছাড়া ভূমি ইজারা চুক্তিতে শব্দের ব্যবহারে অস্পষ্টতা ও ভবিষ্যৎ স্থানান্তরে বেজার ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেও অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ অনুমোদন করে না।

ব্যাংকঋণ নিয়ে জটিলতায় উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা : অর্থনৈতিক অঞ্চলে যাঁরা শিল্প ইউনিট পরিচালনা করছেন তাঁদের ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া যেন সহজ করা হয় এ জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছেন।

তাঁরা লিজ চুক্তির যে কাঠামো আছে তাতে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ঋণগ্রহীতার ডিফল্ট হলেও বন্ধক ভূমি তৃতীয় পক্ষের কাছে কোনো বাধা ছাড়াই স্থানান্তর করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বিনিয়োগকারীরা আরো বলেন, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিপুল শিল্পায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর এ চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। তাই ভূমি ইজারার ব্যালান্স পেমেন্ট চাওয়ার আগেই যেন বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবসা এবং সড়ক সংযোগসহ ইউটিলিটির যাবতীয় সেবা প্রদানে বিলম্বের জন্যও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা : ডিবিএলের এমডি এম এ জব্বার বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করেছি নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য, যাতে আমাদের বিনিয়োগ টেকসই হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তিনটি শিল্প ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছি, যেখানে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’

তিনি জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী তারল্য সংকটে ভুগছেন। কারণ নীতি সহায়তা ঘাটতির কারণে লিজধারীরা ঋণ নিতে পারছেন না।

কভিড-১৯-এর কারণে যে সুযোগ এসেছে তা কাজে লাগানোর আহ্বান : কভিড-১৯ সংকট বিদেশি বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে আমাদের জন্য দারুণ সুযোগ নিয়ে এসেছে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বিদেশিদের। এমন তথ্য জানিয়ে ডিবিএলের এমডি এম এ জব্বার বলেন, ‘দেশের শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এটিই সঠিক সময়।’ তিনি জানান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি ভারত বিনিয়োগে একটি ভালো পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এ সুযোগ কাজে লাগাতে না পারে, তবে শিল্পায়নে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে।

মন্তব্য