kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

বিশেষ লেখা

মেয়েটির নাম ইতি

ইমদাদুল হক মিলন

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেয়েটির নাম ইতি

মেয়েটির পুরো নাম ইতি আক্তার সেলিনা। বয়স ১৭ বছর। গত বছর কাশিনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত পাস করতে পারেনি। পরেরবারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ময়মনসিংহের মেয়ে। নান্দাইল উপজেলার বনাটি বাজুপাড়া গ্রামে তাদের বাড়ি। ইউনিয়ন রাজগাতী।

ইতির বাবা সাহেদ আলী, চাচা লাল মিয়া। পৈতৃক জমি নিয়ে দুই ভাইয়ের বিরোধ দীর্ঘদিনের। গ্রামপ্রধানদের বিচার সালিসের সিদ্ধান্ত যায় সাহেদের পক্ষে। লাল মিয়া তা মানেননি। শেষ পর্যন্ত লাল মিয়ার ছেলেরা সাহেদের ছেলেদের ওপর হামলা চালায়। তাদের সঙ্গে দেশীয় অস্ত্র সড়কি, বল্লম ইত্যাদি ছিল। লাল মিয়ার এক ছেলে সাহেদের ছেলের দিকে বল্লম ছুড়ে মারতে গেছে। এ দৃশ্য দেখেই ভাইকে বাঁচাতে ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে ইতি। লাল মিয়ার ছেলের ছোড়া বল্লম এই বোন ভাইয়ের গায়ে লাগতে দেয়নি। ভাইকে বল্লমের হাত থেকে বাঁচাল, কিন্তু নিজে বাঁচতে পারল না। বল্লম এসে গেঁথে গেল তার গলায়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে জীবনের ইতি ঘটল ইতি নামের মেয়েটির। ভাইয়ের জন্য বোন অকাতরে বিলিয়ে দিল তার প্রাণ।

এই ঘটনা লেখা হয়েছে আমাদের কালের কণ্ঠ পত্রিকার ৫ জুলাই সংখ্যায়। কয়েক দিন আগে আরেকটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল কালের কণ্ঠে। বাবা, ভাই ও মামা মিলে বাড়ির মেয়েটিকে গলা টিপে হত্যা করেছে। রাতের বেলা সেই মেয়ে গিয়েছিল তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে। মামা টের পেয়ে মেয়ের বাবা ও ভাইকে জানায়। সেই রাতেই তিনজন মিলে মেয়েটিকে হত্যা করে। মামা না হয় একটু দূরের মানুষ। বাবা কিংবা ভাই কী করে পারেন কন্যা কিংবা বোনটিকে গলা টিপে হত্যা করতে? প্রেম কি কোনো অপরাধ?

আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ঘটছে এ ধরনের ঘটনা। বাবা হত্যা করছেন শিশুসন্তানকে। স্বামী হত্যা করছেন স্ত্রীকে। প্রেমিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্ত্রী হত্যা করছেন স্বামীকে। এসব কী শুরু হয়েছে? বাঙালি জাতি তো কখনো এ রকম নৃশংস ছিল না। বাঙালির সবচাইতে বড় সম্পদ তার আবেগ। পরিবার ও সমাজের ক্ষেত্রে, সম্পর্ক ও মানবিকতার ক্ষেত্রে, দেশপ্রেমের গভীরতর উপলব্ধিতে চিরকাল ধরে আলোকিত হয়ে আছে বাঙালি। সেই জাতি কী করে এমন অমানবিক হয়ে উঠছে? খবরের কাগজে, টেলিভিশনে প্রতিনিয়তই আমরা দেখছি নারী ও শিশু নির্যাতন, ভয়ংকর সব হত্যাকাণ্ড, সামান্য কারণে মানুষের হিংস্র হয়ে ওঠা। বাড়ির শিশু গৃহকর্মীটিকে পুড়ে লাল টকটকে হওয়া খুন্তির ছেঁকা, নিখোঁজ হওয়া শিশুর লাশ পাওয়া যাচ্ছে কয়েক দিন পর। কেন এমন হচ্ছে? কোন মানসিক যন্ত্রণায় পীড়িত হচ্ছি আমরা? কোন মানসিক যন্ত্রণা কিংবা লোভে, কোন হিংসা-বিদ্বেষে এমন প্রতিশোধপরায়ণ আমরা হচ্ছি? ভাই ভাইকে হত্যা করছি। পুত্র হত্যা করছে পিতাকে। মা হত্যা করছেন সন্তানকে। বাংলাদেশের এই নরম এবং ভালোবাসামাখা প্রকৃতিতে এ কোন কালোছায়া আমাদের আচ্ছন্ন করছে? দেশের প্রতিটি শিক্ষিত বিবেকবান মানুষের এই বিষয়গুলো নিয়ে এখন ভাবতে হবে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ বের করতে হবে।

আবার ইতির কথায় ফিরি। বাঙালি মেয়েরা চিরকাল কিন্তু ইতির মতোই। নিজের জীবন দিয়ে সন্তানের জীবন বাঁচান, স্বামীর মঙ্গলের জন্য বিলিয়ে দেন জীবন। মা-বাবার মুখপানে চেয়ে জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে দেন জীবন। ইতি যেমন দিয়ে গেল।

ইতির মরদেহ পড়ে ছিল তাদের বাড়ির আঙিনায়। মা-বাবা, ভাই-বোনদের আহাজারি চলছিল। পুলিশ তৈরি করছিল সুরতহাল রিপোর্ট। পুলিশ কাউকে কাউকে গ্রেপ্তারও করেছে। অন্যদেরও নিশ্চয়ই গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু যে ভাইয়ের জন্য বোনটি জীবন দিল সেই ভাইটির মনের অবস্থা কেমন? যত দিন বেঁচে থাকবে এই ভাই, তার কি প্রতিটি মুহূর্তে মনে পড়বে না, তার এই জীবন বোনটির জীবনের বিনিময়ে? বোনটির জন্য গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তার বুকটা কি হু হু করবে না? বোনের জন্য চোখের জল কি এই জীবনে ফুরাবে তার?

ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কিছু নীতিকথা মনে পড়ে। যেমন : ‘পৃথিবীর সব থেকে মিষ্টি ভালোবাসা ভাই-বোনের ভালোবাসা।’ ‘ভাই-বোনের ভালোবাসার সঙ্গে অন্য কারো ভালোবাসার তুলনা হয় না।’ ‘বোন মানে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, যে ভাইকে সব সময় আগলে রাখে।’ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেখেছি দেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে ভাইকে পাঠাচ্ছেন বোন। যাও, দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসো। দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভাইটি হয়তো ফিরে আসেননি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে বাংলার কোনো প্রান্তে সমাহিত হয়েছেন। কিন্তু বোন সেই ভাইয়ের পথ চেয়ে বসে থেকেছেন। চোখের জলে ভেসেছেন। আমাদের মা-বোনদের এই আবেগের জায়গাগুলো এখনো আছে। কিন্তু ভেতর থেকে বদল হয়েছে আমরা যারা পুরুষ মানুষ আমাদের মানসিকতার। আমাদের আবেগ নষ্ট হয়েছে, আমাদের ভালোবাসা নষ্ট হয়েছে! আমাদের স্নেহ, মায়া, প্রেম এবং হৃদয়বৃত্তিক জায়গাটি নষ্ট হয়েছে। এই নষ্ট জায়গাটা মেরামত করতে হবে। আমরা ভালোবাসা এবং আবেগে পরিপূর্ণ বাঙালি হয়ে থাকতে চাই। মায়ার বন্ধনে পরস্পর আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাই। আমরা আমাদের আবেগের জায়গাটি কিছুতেই নষ্ট করতে চাই না। মনে রাখতে হবে, ভালোবাসার সমাজই শ্রেষ্ঠ সমাজ, ভালোবাসার দেশই শ্রেষ্ঠ দেশ। বাংলাদেশকে আমরা তেমন দেশ হিসেবে তৈরি করব, যে দেশে ইতির মতো করে প্রাণ দিতে হবে না কোনো বোনকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা