kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

গভীর মন্দায় বিশ্ব অর্থনীতি

কর্মী ছাঁটাই ও দেউলিয়ার পথে অনেক কম্পানি

► যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়ার আবেদন বেড়েছে ৪৩ শতাংশ
► বেকার ভাতার আবেদন করেছে পাঁচ কোটি মানুষ
► আউটলেট বন্ধ করছে বৈশ্বিক ফ্যাশন কম্পানিগুলো

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কর্মী ছাঁটাই ও দেউলিয়ার পথে অনেক কম্পানি

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে জুনের শুরুতে অর্থনীতি খুলে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হলেও দ্বিতীয় দফায় করোনার সংক্রমণ জানান দিল বিষয়টি অত সহজ নয়। গত দুই সপ্তাহে দেশটিতে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে ৪৩ শতাংশ, দুই ডজনেরও বেশি অঙ্গরাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা আবারও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দেশটিতে করোনার কারণে গত সাড়ে তিন মাসে বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছে চার কোটি ৮৪ লাখ লোক।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ার জেরোমে পাওয়েল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের শিগগিরই কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। দ্বিতীয় দফায় করোনা সংক্রমণের কারণে পুরো পরিস্থিতিই এখন অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছে।’ এমন অনিশ্চয়তা

এখন পুরো বিশ্বেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানায়, চীন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, ভারতসহ বড় সব দেশের অর্থনীতিই এ বছর সংকোচনে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, করোনার কারণে দুই বছরে বিশ্ব অর্থনীতি হারাবে ১২ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ব অর্থনীতি ৪.৯ শতাংশ সংকুচিত হবে। এ বছর ইউরো অঞ্চল সংকুচিত হবে ১০.২ শতাংশ এবং আর আমেরিকায় সংকুচিত হবে ৮ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক বলছে, গভীর মন্দায় তলাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি, যা হবে ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মহামারিতে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে কয়েক মাস যাবৎ। এতে বিশ্বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালে ৫.২ শতাংশ সংকুচিত হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনীতির সব খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে এবারের সংকটের কারণে যে বিপুলসংখ্যক দেশ আর্থিক মন্দায় পড়েছে তাতে এ অর্থনৈতিক সংকটকে ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা যায়।

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিয়েলা পাজারবাসিওগ্লু বলেন, এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক সংকট, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষত রেখে যাবে। সংকটের তীব্রতা সাত থেকে ১০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যে ফেলবে।

করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত প্রায় এক কোটি ১২ লাখ মানুষ। মৃত্যু পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, করোনা মহামারিতে বিশ্বজুড়ে অব্যাহতভাবে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে আছে, যা মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক।

আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার বড় বড় কম্পানি এখন কর্মী ছাঁটাই করছে এবং দেউলিয়ার আবেদন করছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি ঘোষণা দিয়েছে, তারা বিশ্বজুড়ে তাদের শাখাগুলোতে ৩৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস জানায়, তারা ১৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে। কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কম্পানির মধ্যে আরো রয়েছে জার্মানির বিমান সংস্থা লুফথানসা, ফ্যাশন কম্পানি মালবেরি, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইজিজেট, বিপি, ভার্জিন আটলান্টিক, রায়নেয়ার, রেনল্ট, টুই, থাইজেনক্রাপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এয়ারলাইনস ও সুইডিশ কম্পানি ভলভোসহ কয়েক শ প্রতিষ্ঠান।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক সংকটে থাকা কম্পানিগুলোর দেউলিয়া আবেদনের জোয়ার আসছে এ বছর। ছোট থেকে বড় সব ধরনের কম্পানিই করোনা মহামারিতে আক্রান্ত। ২০২০ সালের প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আর্টিকল ১১-এর আওতায় তিন হাজার ৬০৪ কম্পানি দেউলিয়ার আবেদন করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। আইনসেবা প্রতিষ্ঠান এপিক সিস্টেমস ইনকরপোরেশন এমন তথ্য জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, জুন মাসে দেউলিয়ার আবেদন আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে ৪৩ শতাংশ।

যেসব বৈশ্বিক ফ্যাশন কম্পানি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে বা বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে তাদের অন্যতম ডিভিএফ স্টোডিও, জেসি পেনি, নিম্যান মারকোস গ্রুপ, আলডো গ্রুপ, জন ভারভ্যাটরস, জে হিলবার্ন, ট্রু রেলিজিয়ন, ফরেভার ২১, জারা, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট, পিয়ার ১ ইত্যাদি। জারা তাদের এক হাজার ২০০ স্টোর বন্ধ করে দিয়েছে। লা চ্যাপেল চার হাজার ৩৯১ স্টোর তুলে নিয়েছে। কফি কম্পানি স্টারবাকসও তাদের ৪০০ স্টোর বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে স্থায়ীভাবে।

করোনার কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে তাকে দেশটির ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিও। দেশটিতে এরই মধ্যে গত ৩০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে কৌশল আসলে কী হবে, যাতে মানুষকে সুস্থ রাখা যায় এবং একই সঙ্গে অর্থনীতিও রক্ষা করা যায়? এ জন্য বিশ্বজুড়ে তথ্য শেয়ার করতে হবে এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে। তাহলে এ অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিশ্বনেতারা অর্থনীতি চালু রাখার কার্যকর কৌশল খুঁজে পাবেন। সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, নিউ ইয়র্ক টাইমস।

 

 

মন্তব্য