kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

চলে গেলেন লতিফুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চলে গেলেন লতিফুর রহমান

জন্ম ১৯৪৫, মৃত্যু ২০২০

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান আর নেই। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়ায় নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়েসহ বহু আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

লতিফুর রহমানের মৃত্যুতে বিভিন্ন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্বনামধন্য ব্যবসায়ী, সমাজের বিশিষ্টজন ও ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক জানানো হয়েছে। দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপও গভীর শোক জানিয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারির এ সময়ে গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন বরেণ্য এই ব্যবসায়ী। তবে তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন না। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গতকাল সন্ধ্যার দিকে তাঁর মরদেহ চিওড়া গ্রামের ‘ফারাজ মঞ্জিল’ থেকে ঢাকায় আনা হয়। রাত সাড়ে ৮টায় তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় গুলশানের বাসভবনে। সেখানে ২৫ মিনিটের মতো রাখা হয়। এরপর রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় গুলশানে আজাদ মসজিদে। রাত ১০টায় বনানী কবরস্থানে ছোট মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমানের পাশে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

লতিফুর রহমানের গ্রামের বাড়ির সহকারী ব্যবস্থাপক হুমায়ন কবীর কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে লতিফুর রহমান নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। বার্ধক্যজনিত কারণে প্রায়ই তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যেত। গতকালও হঠাৎ করে তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যায় এবং তিনি মারা যান।

লতিফুর রহমান এমন একদিনে মারা গেলেন, যেদিন তাঁর নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকী। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারাজ হোসেন ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় নিহত হন।

ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান লতিফুর রহমান দাদা ও বাবার পথ ধরে ব্যবসায় নেমে এ দেশে অন্যতম বৃহৎ একটি ব্যাবসায়িক গ্রুপ গড়ে তোলেন। তিনি আমৃত্যু ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন। ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য, ওষুধ, ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, চা শিল্প, বীমা ইত্যাদি ব্যবসায় ব্যাপক সাফল্য পান। ট্রান্সকম গ্রুপ, যার উৎপত্তি হয়েছিল চা চাষের মাধ্যমে, এখন দেশের অন্যতম একটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, যার রয়েছে ১৬টি কম্পানি। তিনি নেসলে বাংলাদেশ, হোলসিম বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি লিন্ডে বাংলাদেশ এবং এনজিও ব্র্যাকের গভর্নিং বোর্ডের পরিচালক। এ ছাড়া তিনি ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি), বাংলাদেশের সহসভাপতি ছিলেন।

লতিফুর রহমান এ দেশে গণমাধ্যম ব্যবসায়ও বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তিনি দৈনিক প্রথম আলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়া স্টার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন।

১৯৪৫ সালের ২৮ আগস্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে জন্ম লতিফুর রহমানের। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। থাকতেন গেণ্ডারিয়ায়। তাঁর পড়াশোনার শুরু সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে। পরে ১৯৫৬ সালে শিলংয়ের সেন্ট এডমন্ডস স্কুল এবং এরপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। পরের বছর ডাব্লিউ রহমান জুটমিল ট্রেইনি হিসেবে কাজ শুরু করেন। দেড় বছর কাজ শেখার পর নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। এভাবে কাজ করেন ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি সব কিছু নতুন করে শুরু করেছিলেন।

দাদা ও বাবা ব্যবসায়ী হলেও নিজে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ব্যাংকঋণ নিয়ে। ১৯৭৪ সালে চা ব্যবসার জন্য ৫০ লাখ টাকার ব্যাংকঋণই লতিফুর রহমানের ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নানা ব্যবসায় যুক্ত হন ও দেশের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যবসায়ীতে পরিণত হোন। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা, সুনাম আর সততার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে তিনি পান বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতের নোবেল বলে খ্যাত।

বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শোক : লতিফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহ্মুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), আমিন মোহাম্মদ গ্রুপসহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

মন্তব্য